ভূমিকম্প উৎপত্তি হতে পারে এমন ফল্ট নেই মধুপুরে

ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইলের মধুপুর। এখানেই রয়েছে একটি ফল্ট বা চ্যুতি, যেখান থেকে উৎপত্তি হতে পারে ভয়াবহ ভূমিকম্প। আর মুহূর্তেই ল-ভ- হতে পারে রাজধানী ঢাকা। এতদিন একদল গবেষক এই তত্ত্ব প্রচার করে রাজধানীবাসীর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, মধুপুর ফল্টের দাবিটি পুরোপুরি ভুল। মধুপুরে এমন কোনো ফল্ট নেই, যেখান থেকে মেগাথ্রাস্ট বা বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হতে পারে। নতুন এই গবেষণা বাংলাদেশের ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে এতদিনের ধারণা বদলে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি বাপেক্সের ভূ-অভ্যন্তরীণ চিত্র অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবে বিশ্লেষণ করে নতুন এই ফলাফল পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের (এজিইউ) সম্মেলনে গবেষণাটি উপস্থাপিত হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে গবেষণাপত্রটি প্রকাশের জন্য সাবমিট করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ ও শীর্ষস্থানীয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অবার্নের সুনাম রয়েছে।

অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় পাওয়া এই তথ্য দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) উপপরিচালক আক্তারুল আহসান। তিনি বাপেক্স থেকে ভূ-অভ্যন্তরীণ চিত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণার খুঁটিনাটি দিক তুলে ধরেছেন। গত বছর ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট অসংখ্য ভূমিকম্প হয়েছে। গত ১০০ থেকে ১৫০ বছরে দেশে এত বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। যার সবগুলোই আফটারশক। ভূপৃষ্ঠের অন্তত ৩০ কিলোমিটার গভীরে ভূমি কম্পিত হওয়ায় সেখানে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা নেই বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

ভূবিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্প হয়ে থাকে মাটির ৩ থেকে ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে। তবুও নরসিংদীর ওই ভূমিকম্প নিয়ে নানা ধরনের প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়। ভূমিকম্পের পর ভয়ে তারা রাস্তায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ এতটাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে যে, তাদের সাইকোলজিস্টের দ্বারস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হয়েছে। সেসব দিক বিবেচনায় অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা ঢাকার অধিবাসীদের জন্য এক বিরাট সুখবর।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভূমিকম্পে শুধু মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতিই হয় না, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশেও। কোনো দেশকে অতিমাত্রায় ভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে বিবেচনা করা হলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীরা ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতিও বিবেচনা করেন। সেই বিবেচনায়, নতুন এই গবেষণা শুধু ভূমিকম্পের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিবেশের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।

যদিও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্প বিষয়ে তেমন কোনো কাজই করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ভূমিকম্পটি মাটির কত গভীরে সংঘটিত হলো, তা নির্দিষ্ট করে দেখার মতো আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে কোনো যন্ত্র নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, আবহাওয়া অধিদপ্তর বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ভূমিকম্পের তথ্য প্রকাশ করে।

অবার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষণা কী বলছে : যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা বলছে, মধুপুর ফল্টের দাবিটি পুরোপুরি ভুল। প্রচলিত মধুপুর ফল্ট বলতে যমুনা নদী বরাবর বা মধুপুর টেরাসের পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর যে রিভার্স ফল্ট বা বিপরীতমুখী ভূ-চ্যুতি, থ্রাস্ট ফল্ট বা চাপের কারণে সৃষ্ট ভূ-চ্যুতি বোঝানো হয়, এমন কোনো ফল্ট নেই মধুপুর এলাকায়। মধুপুর টেরাসের নিচে প্রায় ১০টির মতো ফল্ট আছে। এদের কোনোটির বৈশিষ্ট্য মধুপুর ফল্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এগুলো উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক বরাবর বিস্তৃত, যা মধুপুর ফল্টের সঙ্গে আড়াআড়ি এবং সম্পূর্ণ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষণা বলছে, এগুলো সবই হয় নরমাল ফল্ট বা স্বাভাবিক ভূ-চ্যুতি নতুবা স্ট্রাইক-সিøপ ফল্ট বা অনুভূমিকভাবে সৃষ্ট ভূ-চ্যুতি।

বাংলাদেশের ভূমিকম্প বিষয়ে বাপেক্সের মাটির নিচের ইমেজ বা ছবির প্রকৃতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবে ড. ব্রায়ান বোস্টন ও ড. উইলিয়াম হেমসের তত্ত্বাবধানে এই গবেষণা হয়। গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লামন্ট-ডোহার্টি আর্থ-অবজারভেটরির ড. মাইক স্টেকলারও সম্পৃক্ত রয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানটিতেও বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্প, ভূতত্ত্ব, টেকটোনিক প্লেট, জলবায়ু, সমুদ্র ও পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন নিয়ে গবেষণা করেন।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান ২০০৯ সাল থেকে আর্থ  অবজারভেটরি অব সিঙ্গাপুর এবং ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘কাইনেম্যাটিক্স অব ইস্টার্ন সিনট্যাক্সিস বা পূর্বাঞ্চলীয় ভূ-গঠনের গতিশীলতা’ শিরনামে একটি ভূমিকম্প গবেষণায় সংযুক্ত হন।

মধুপুর ফল্টের ধারণা যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় : জেমস পি. মরগান ও উইলিয়াম জি. ম্যাকইনটায়ার ১৯৫৯ সালে ‘কোয়াটারনারি জিওলজি অব দ্য বেঙ্গল বেসিন, ইস্ট পাকিস্তান অ্যান্ড ইন্ডিয়া বা বেঙ্গল অববাহিকা, পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের চতুর্থ ভূতাত্ত্বিক যুগের ভূতত্ত্ব’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তারা মধুপুর ট্র্যাক্টের (মধুপুরের অঞ্চল) পশ্চিম প্রান্তের এন এশেলন ফল্ট অর্থাৎ এমন কয়েকটি ভূ-চ্যুতির কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো একটি সরল রেখায় না থেকে পাশাপাশি ধাপের মতো তির্যকভাবে সাজানো থাকে। ঢাকা শহরে ভূমিকম্পের আশঙ্কার প্রায় পুরোটাজুড়েই রয়েছে মধুপুর ফল্ট। নতুন এই গবেষণা বলছে, এটা একটি মিথ অর্থাৎ কাল্পনিক বা প্রচলিত বিশ্বাস ছাড়া কিছুই নয়।

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ২০১০ সালে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, মধুপুর ফল্টে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরে ৫৩ হাজারের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ১ কোটি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলেও ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

বাপেক্স থেকে তথ্য পেতেই ১৩ বছর : জানা যায়, ২০১০ সালে মধুপুর ফল্ট নিয়ে গবেষণার আগ্রহ সৃষ্টি হলে আক্তারুল আহসান মধুপুরের ভূগঠনের উপরিভাগ পর্যালোচনা করেন। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট ইমেজের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করেন। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে মধুপুরের ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ দেখে ফল্ট না থাকার বিষয়ে তার বদ্ধমূল ধারণা হয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে মাটির নিচের তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করা জরুরি ছিল। এই তথ্যের পুরোটা থাকে বাপেক্সের কাছে। বাপেক্স তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সময় যে ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে, সেখানে মাটির নিচের ছবি এবং প্রতি ইঞ্চি মাটির ভূগঠনের নমুনা বিশ্লেষণ থাকে।

প্রথমে ২০১০ সালের দিকে ভূতাত্ত্বিক আক্তারুল আহসান পেট্রোবাংলার কাছে তথ্য চেয়ে ব্যর্থ হন। কিন্তু তিনি হাল ছেড়ে না দিয়ে নানাভাবে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর ২০২৩ সালের দিকে দেশে ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয় বাস্তব অবস্থা জানার জন্য। কারণ তখন দেশের সংবাদমাধ্যমে ভূমিকম্প নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচারের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে বাপেক্স তাদের ভূতাত্ত্বিক জরিপ লাইনের মধ্যে ৫২টি লাইনের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

গবেষক আক্তারুল আহসানের বক্তব্য : গবেষণায় দেখা গেছে, বগুড়া থেকে মেঘনা নদী পর্যন্ত মাটির নিচে অনেকগুলো  ফল্ট  আছে। এদের বেশিরভাগই রিফটিং ফল্ট বা ভূত্বকপ্রসারণজনিত চ্যুতি, নরমাল ফল্ট বা স্বাভাবিক ভূ-চ্যুতি ও স্ট্রাইক- স্লিপ ফল্ট বা অনুভূমিক সঞ্চালনজনিত ভূ-চ্যুতি। কোনো রিভার্স ফল্ট বা বিপরীতমুখী ভূ-চ্যুতি ও থ্রাস্ট ফল্ট চাপজনিত ভূ-চ্যুতি নেই। মেঘনা নদী থেকে বেঙ্গল মেগাথ্রাস্ট-বেঙ্গল অঞ্চলের বৃহৎ ভূ-চ্যুতি শুরু এবং রূপগঞ্জ-মেঘনা এলাকা থেকে আমাদের রিভার্স থ্রাস্ট ফল্ট বা বিপরীতমুখী চাপজনিত ভূ-চ্যুতি শুরু হয়েছে। মধুপুর এলাকায় উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বা যমুনা নদী বরাবর কোনো রিভার্স থ্রাস্ট বা বিপরীতমুখী চাপজনিত ভূ-চ্যুতি নেই, তথা কোনো মধুপুর ফল্টের অস্তিত্ব নেই।