পরিসংখ্যানের আড়ালে রাষ্ট্রের দায়

একটি দেশের নারী ঘরের ভেতর, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাস্তায় কতটা নিরাপদ এবং একটি শিশু কতটা নির্ভয়ে বেড়ে উঠতে পারে, তার মধ্য দিয়েই সেই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি পাওয়া যায়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই ছবিকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার সংখ্যা শুধু বাড়ছে না, কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতার ধরন আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের বিপর্যয় এবং সহিংসতার দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষত। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) আগস্ট মাসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য উদ্বেগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নিজস্ব অনুসন্ধানের তথ্য নিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, জুলাইয়ে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ৩০৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৭টিতে। মোট বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু সামগ্রিক সংখ্যার চেয়ে সহিংসতার কয়েকটি ধরনে বৃদ্ধির হার অনেক বেশি ভয়াবহ। জুলাইয়ে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা ছিল ৫২টি, আগস্টে তা ৯১টিতে পৌঁছেছে। এক মাসে বৃদ্ধি প্রায় ৭৫ শতাংশ। দলবদ্ধ ধর্ষণ সাতটি থেকে বেড়ে ১২টিতে পৌঁছেছে, বৃদ্ধির হার প্রায় ৭২ শতাংশ। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা তিনটি থেকে পাঁচটিতে উঠেছে।

আরও একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগস্টে সাধারণ ধর্ষণের নথিভুক্ত ঘটনা জুলাইয়ের ৮৫টি থেকে কমে ৭০টিতে এবং ধর্ষণের চেষ্টা ৩৪টি থেকে ২১টিতে নেমেছে। কিন্তু একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ও নারী-শিশু হত্যার সংখ্যা বেড়েছে। ফলে কেবল মোট ঘটনার সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে সহিংসতার ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুরতার দিকটি আড়ালে থেকে যেতে পারে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত আছে পরিবার ও সমাজে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব, শিশুর অসহায় অবস্থান, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীকে রক্ষা করার প্রবণতা এবং অভিযোগ জানাতে ভুক্তভোগীর ভয়। অনেক নারী পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না। শিশুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। যে শিশুটি নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধের প্রকৃতি বুঝতে পারে না, তার পক্ষে আইনি সহায়তার কাছে পৌঁছানো আরও দুরূহ। সহিংসতার পর আরেক ধরনের লড়াই শুরু হয়। থানায় অভিযোগ গ্রহণ থেকে চিকিৎসা, আলামত সংরক্ষণ, তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং বিচার পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ভুক্তভোগী ও পরিবারকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। সামাজিক অপবাদও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অপরাধের শিকার মানুষটি একই সঙ্গে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েন। পরিবার হারানো শিশু, সহিংসতায় সন্তান হারানো মা-বাবা এবং যৌন সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুর জীবনে একটি অপরাধের অভিঘাত বহু বছর থেকে যেতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বেআইনি সালিশের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। এমএসএফ আগস্টে এমন চারটি ঘটনার তথ্য দিয়েছে। ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে, শিশুর যৌন হয়রানির ঘটনায় বেত্রাঘাত ও জরিমানা, এমনকি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। এমন প্রবণতা অপরাধীর মধ্যে দায়মুক্তির সাহস বাড়াতে পারে এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তোলে। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতার কথা বলেছে। ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গের কারণে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা রয়েছে। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা তাই কেবল সামাজিক সদিচ্ছার বিষয় হতে পারে না, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন আছে, বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল আছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। তারপরও সহিংসতা যখন বারবার ফিরে আসে, তখন আইনের অস্তিত্বের পাশাপাশি তার প্রয়োগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন জরুরি। অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ আলামত সংগ্রহ, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং বিচার প্রক্রিয়ার অযথা বিলম্ব কমানো একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। থানায় নারী ও শিশুবান্ধব অভিযোগ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর কর্মসূচি প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনকে বেআইনি সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ মীমাংসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা সহজলভ্য করতে হবে।

এমএসএফের ৩২৭টি নথিভুক্ত ঘটনা আমাদের সামনে ৩২৭টি আলাদা মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরে। আরও কত ঘটনা সংবাদমাধ্যম, থানা ও মানবাধিকার সংগঠনের নথিতে পৌঁছায়নি, তার পূর্ণ হিসাব আমাদের জানা নেই। তাই সংখ্যার ওঠানামা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত একজন নারী কতটা নির্ভয়ে চলতে পারেন, একটি শিশু কতটা নিরাপদে ঘুমাতে পারে এবং সহিংসতার শিকার একজন মানুষ কত দ্রুত ন্যায়বিচারের কাছে পৌঁছাতে পারেন। নারী ও শিশুর জীবন যদি নিরাপদ না হয়, উন্নয়নের অন্য সব হিসাবের পাশে একটি গভীর অসম্পূর্ণতা থেকেই যায়।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী

shahedkayes@gmail.com