কৃষিপ্রধান অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি খাতকে নানা রকম প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার পথ মাড়িয়েই এগোতে হচ্ছে। কখনো প্রাকৃতিক অভিঘাত, কখনো কৃষি ও কৃষকের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি হয়ে পড়ে কতিপয় লোভাতুরের স্বার্থান্বেষী থাবায়, কখনো বা দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতায় বৈরী চিত্র দৃশ্যমান হয়। কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘কচুরিপানায় ডুবছে কৃষি’ শিরোনামে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কৃষির নতুন সংকট-চিত্র। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের মূল চালিকাশক্তি চলনবিল এখন তার চিরচেনা রূপ হারাতে বসেছে। নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ বিলের বিভিন্ন এলাকায় নদী ও খালের মুখ কচুরিপানায় আটকে থাকায় পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় আসন্ন রবিশস্যের আবাদ নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয় কৃষকরা। কচুরিপানার এই সংকট শুধু চলনবিল অঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে ভাটি বাংলায় কৃষির জন্য অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমরা জানি, এই মৌসুমে চলনবিল পানিতে টইটুম্বুর থাকার কথা। নৌকার ছলাৎ ছলাৎ মৃদু আওয়াজ আর মাছ শিকারিদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভিন্ন পরিবেশ দৃশ্যমান হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে এখন শুধুই কচুরিপানার জট। দেখতে হয়তো এই দৃশ্য অপরূপ, কিন্তু বাস্তবে তা ডেকে আনছে বড় সংকট। পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, কমছে দেশীয় মাছের প্রজনন এবং সংকুচিত হচ্ছে নদীনালা। দেশের অনেক স্থানেই ঋতু পরিক্রমার ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যের সেই সৌন্দর্যের রূপ আর দেখা যায় না। অথচ কী ধান, কী মাছ, কী ঋতু, কী গাছ, কী মানুষ, কী ভাষা, কী উৎসব এমন বৈচিত্র্য বাংলাদেশে আজ বদলে গেছে অনেক কিছুই এবং এর বহু কিছুই নয় কল্যাণকর। ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্নরূপে সাজত যে প্রকৃতি, সেই প্রকৃতি অনেকাংশেই মুনষ্যসৃষ্ট অভিঘাতে বিপন্ন-বিপর্যস্ত। এই যে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের পথে বিঘ্ন সৃষ্টির কারণে কচুরিপানার জটলা
কৃষির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তা খাটো করে দেখার অবকাশ রাখে না। অপরিকল্পিত সড়ক, বসতবাড়ি, বাঁধ, পুকুর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং চলনবিল অঞ্চলে তা প্রকট রূপ নিয়েছে। এর পাশাপাশি আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানীসহ বিলের সঙ্গে যুক্ত নদী ও নালাগুলোতে পলি জমে নাব্য কমেছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো দেশের কৃষি খাতের সংস্কার জরুরি। সংস্কারে হাত দিলে কৃষির সামনে বিদ্যমান সংকট নিরসনের পথ সুগম হবে। একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ুর অভিঘাতে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। কমেছে প্রবৃদ্ধিও। বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষির পথ নিষ্কণ্টক করা জরুরি। সার, বীজ, কীটনাশকের মতো উপাদানের জন্য আমদানিনির্ভরতাও বাড়ছে। সেচ যন্ত্রের ৮০ শতাংশ বিদেশ থেকে আসছে। এত কিছুর মধ্যে এখন কচুরিপানার জটলা আরেক নতুন সংকট। এই নিরিখে কৃষি গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে কৃষির বিকাশ ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোর নিরসনের পথ প্রশস্ত করা যায়।
পানিপ্রবাহের পথ অগভীর হয়ে পড়ায় বর্ষায় উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা বাধার মুখে পড়ে চলনবিল ও নদীর বিভিন্ন অংশে জমে সংকট সৃষ্টি করছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিল অঞ্চলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১০ কিলোমিটার। এর বৃহদাংশই পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। এক সময় এসব খাল-নালা থেকে হাজার হাজার কৃষক সেচের পানি পেতেন এখন তারা এ থেকে বঞ্চিত। চলনবিলসহ ও অন্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে আবহাওয়া ও পরিবেশগত ভারসাম্যও পরিবর্তিত হওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। শুধু চলনবিলেরই নয়, সর্বত্রই প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, প্রকৃতিকে অভিঘাত না করে অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। চলনবিলের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে জরুরি হচ্ছে শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার নয়, নদী-খাল পুনরুদ্ধার করে পানিপ্রবাহের পথ স্বাভাবিক করা এবং এজন্য দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করা। তা না হলে আরও সংকটে নিপতিত হবে কৃষি, মাছ, জীববৈচিত্র্য ও আমাদের চিরচেনা জীবনচিত্র।