বই মানুষকে আলোকিত করে

মানুষ জন্মগতভাবে সবকিছু জানে না। শিখতে হয়। নিজের অজ্ঞতার সীমা পেরিয়ে সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আর এই দীর্ঘ যাত্রায় বই অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী। বই মানুষকে আলোকিত করে, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে এবং চিন্তাকে শানিত করে। বই পড়া এবং জ্ঞানার্জনকে ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতেই এসেছে পড়ার নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক ১)

মানুষের স্মৃতি সীমিত। একজন মানুষের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, চিন্তা, গবেষণা ও উপলব্ধি বইয়ের পাতায় জায়গা করে নিতে পারে। এরপর সেই জ্ঞান পৌঁছে যেতে পারে বহু মানুষের কাছে। এমনকি লেখকের মৃত্যুর পরও।

বই জ্ঞান সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পাঠক যখন কোনো বই পড়েন, তখন তিনি অন্য মানুষের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন। শত বছর আগের কোনো মনীষীর চিন্তাও তার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।

ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসেও বইয়ের ভূমিকা অসাধারণ। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আকিদা, সিরাত ও ইসলামের ইতিহাসের বিপুল জ্ঞান প্রজন্মের পর প্রজন্ম গ্রন্থের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। আলেমরা জ্ঞান অর্জন করেছেন, তা যাচাই করেছেন, লিপিবদ্ধ করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

বই পড়ার সবচেয়ে বড় উপকারগুলোর একটি হলো, এটি মানুষকে ভাবতে শেখায়। শুধু তথ্য জানাই জ্ঞান নয়। জানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করা, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য বোঝা এবং জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাও জ্ঞানের অংশ। কোরআন বারবার মানুষকে চিন্তা ও অনুধাবনের দিকে আহ্বান করেছে। আকাশ, পৃথিবী, রাত ও দিনের পরিবর্তন, মানুষের সৃষ্টি এবং জীবনের অসংখ্য নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে বলেছে।

ভালো বই মানুষের চিন্তার পাশাপাশি চরিত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ জাগাতে পারে। অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখাতে পারে। অন্যায় থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। ইসলামি বইয়ের একটি বড় উদ্দেশ্যও হলো মানুষের আত্মশুদ্ধি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (সুরা শামস ৯)

তাই বই পড়ার পর যদি মানুষের অহংকার বাড়ে, কিন্তু বিনয় না বাড়ে, জ্ঞান বাড়ে, কিন্তু আমল না বাড়ে, তথ্য বাড়ে, কিন্তু চরিত্র সুন্দর না হয়, তাহলে সেই পাঠের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়নি।

একজন মানুষ নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক বই পড়তে পারেন। কিন্তু নামাজে তার কোনো পরিবর্তন না এলে সেই জ্ঞান তার জীবনে কতটা আলো ছড়াল, সেটি ভাবার বিষয়। একজন মানুষ সত্যবাদিতা নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারেন। কিন্তু নিজের স্বার্থে মিথ্যা বলা ছাড়তে না পারলে তার জ্ঞান চরিত্রে প্রতিফলিত হলো না।

তাই বই পড়ার সঙ্গে আত্মজিজ্ঞাসাও জরুরি। আমি যা পড়ছি, তা কি আমাকে বদলাচ্ছে? আমার চিন্তা কি পরিশুদ্ধ হচ্ছে? আমার আচরণ কি সুন্দর হচ্ছে? আল্লাহর প্রতি আমার সম্পর্ক কি আরও গভীর হচ্ছে?

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানচর্চার যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মুসলিম মনীষীরা শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, ভূগোল, ভাষা ও ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তারা বই পড়েছেন। বই লিখেছেন। জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন। জ্ঞান বিতরণ করেছেন।

ইমাম বুখারি (রহ.) হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনের জন্য দীর্ঘ সফর করেছেন। ইমাম নববি (রহ.) বিপুল জ্ঞান অধ্যয়ন করে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ রেখে গেছেন। তাদের জীবন দেখায়, জ্ঞানচর্চা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করার কাজ।

বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে তথ্যের অভাব নেই। একটি মুঠোফোনে কয়েক মুহূর্তেই হাজারো তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য আর জ্ঞানের গভীরতা এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট পোস্ট মানুষকে দ্রুত তথ্য দেয়। কিন্তু বই মানুষকে কোনো বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ভাবতে শেখায়। ধৈর্য শেখায়। মনোযোগী হতে শেখায়। তাই প্রযুক্তির যুগে বইয়ের প্রয়োজন কমেনি। বরং ভালো বই বেছে পড়ার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

তবে সব বই সবার জন্য উপকারী নয়। পাঠককে বিষয় নির্বাচনেও সচেতন হতে হবে। যে বই জ্ঞান বাড়ায়, চরিত্র সুন্দর করে, সত্যের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং মানুষকে কল্যাণের পথে এগিয়ে নেয়, সেই বই পাঠের যোগ্য।

একজন মুসলিমের পাঠের তালিকায় কোরআন ও তার অর্থ, হাদিস, সিরাত, ইসলামি ইতিহাস ও নৈতিকতা বিষয়ক গ্রন্থের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্ঞানবিষয়ক বই থাকতে পারে। তবে শুধু বই সংগ্রহ করাই উদ্দেশ্য নয়। বই পড়তে হবে। পড়া বিষয় বুঝতে হবে। প্রয়োজনীয় বিষয় নোট করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শেখা বিষয় জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।