স্বাভাবিক প্রসবে বাধা কোথায়

প্রফেসর ডা. মুনিরা ফেরদৌসী

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

আমাদের দেশে সিজারিয়ান সেকশনের হার তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থেকে আমার যে অভিজ্ঞতা তাতে আমি মনে করি এর পেছনে শুধু একটি নয়, অনেক কারণ যুক্ত আছে। রোগী ও পরিবারের মানসিকতা, স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে ভয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার অনীহা, চিকিৎসকদের সীমাবদ্ধতা ও হাসপাতালের প্রয়োজনীয় জনবল ও সহায়তার ঘাটতি সব মিলিয়েই এই পরিস্থিতি।

দেশের অনেক মা স্বাভাবিক প্রসবকে ভয় পান। প্রসবব্যথা কতক্ষণ চলবে, কত সময় অপেক্ষা করতে হবে এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য অনেক সময় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা। প্রয়োজনে প্রসবব্যথা শুরু করানোর জন্য ইনডাকশন দেওয়া। কিন্তু অনেক রোগী ও তার পরিবার সময়টা দিতে চান না। মনে করেন, সিজারিয়ান সেকশন করলে অল্প সময়ের মধ্যে সন্তান জন্ম নেবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ হবে। কারো মধ্যে এমন ধারণা আছে সিজারিয়ান সেকশন করলেই শিশুর জন্য নিরাপদ হবে। এখানে আমাদের আরও বেশি সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রত্যেক রোগীর জন্য সিজারিয়ান যেমন প্রয়োজন হয় না, তেমনি প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করাও নিরাপদ নয়। রোগীর অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এপিসিওটমি নিয়েও অনেকের ভয় রয়েছে।

স্বাভাবিক প্রসবের সময় প্রয়োজন হলে শিশুর জন্ম সহজ করার জন্য যোনিপথের পাশে ছোট ছেদন দিতে হতে পারে। তবে প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না। এই ভয়টা অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যের অভাব থেকে তৈরি হয়। গর্ভাবস্থার সময় থেকেই রোগীকে বোঝানো দরকার, স্বাভাবিক প্রসবের সময় কী হতে পারে, কখন এপিসিওটমি প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিক প্রসব চিকিৎসকের একার কাজ নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো একটি ভালো প্রসবসেবা দল। একজন চিকিৎসকের একার পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে রোগীর পুরো প্রসব প্রক্রিয়া পরিচালনা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। একটি স্বাভাবিক প্রসব কখন হবে, সেটাও সবসময় ঘড়ি ধরে বলা সম্ভব নয়।

এ কারণে আমি মনে করি, ‘স্বাভাবিক প্রসব একজন চিকিৎসকের একার কাজ নয়; দক্ষ ও সমন্বিত দলের কাজ।’ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রী রোগীর পাশে থাকবেন, অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রধান চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। রোগীদের মধ্যেও বিশ্বাস তৈরি করা প্রয়োজন যে, ‘আমার চিকিৎসক প্রতি মুহূর্তে আমার পাশে না থাকলেও তার দল আমার পাশে আছে।’ এই দলগত চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারলে দেশে স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ বাড়বে।

একজন চিকিৎসক যখন স্বাভাবিক প্রসবের জন্য অপেক্ষা করবেন, তখন তার মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকে হঠাৎ কোনো জটিলতা হলে আমি কি প্রয়োজনীয় সব সহায়তা সময়মতো পাব? প্রসবের সময় পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কিছুক্ষণ আগেও মা ও শিশু ভালো অবস্থায় ছিল, কিন্তু হঠাৎ এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই মুহূর্তে যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, অস্ত্রোপচার কক্ষ কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার ব্যবস্থা পাওয়া না যায়, তাহলে চিকিৎসকের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেও অনেক চিকিৎসক দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক প্রসবের জন্য অপেক্ষা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আমাদের বড় সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় জনবল ও হাসপাতালভিত্তিক সহায়তার ঘাটতি।

স্বাভাবিক প্রসব করাতে শুধু একজন গাইনি চিকিৎসক থাকলেই হবে না। মা ও শিশুকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমরা যদি একজন চিকিৎসককে বলি, ‘আপনি স্বাভাবিক প্রসব করান’, তাহলে চিকিৎসককেও প্রয়োজনীয় পরিবেশ দিতে হবে। তার পাশে দক্ষ দল থাকতে হবে। মা ও শিশুর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে দ্রুত অস্ত্রোপচার কক্ষ প্রস্তুত হতে হবে। অ্যানেসথেসিয়া ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবাও প্রস্তুত থাকতে হবে।সহায়তাগুলো না থাকলে চিকিৎসকের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয় তৈরি হবে, ‘হঠাৎ সমস্যা হলে আমি কী করব?’

সবাইকে বুঝতে হবে, স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা মানেই পুরো প্রক্রিয়াটি শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত

থাকবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। প্রসব চলাকালে মা বা শিশুর অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত  নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি সিজারিয়ান সেকশন করতে হতে পারে। তাই যেখানে স্বাভাবিক প্রসব করানো হবে, সেখানে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

কেন এত সিজারিয়ান

আমার মনে হয়, একটা জায়গায় বারবার ভুল করছি। আমরা শুধু বলছি ‘দেশে এত সিজারিয়ান সেকশন কেন হচ্ছে?’ ‘স্বাভাবিক প্রসব কেন কম হচ্ছে?’ আমরা খুব কমই আলোচনা করি। ‘নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব করানোর জন্য চিকিৎসককে আমরা কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছি?’ চিকিৎসকের পাশে পর্যাপ্ত জনবল আছে? প্রশিক্ষিত নার্স ও ধাত্রী আছেন? সার্বক্ষণিকভাবে মা ও শিশুকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে? জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অস্ত্রোপচার করা যাবে? নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রস্তুত আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শুধু চিকিৎসককে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। রোগী, চিকিৎসক, হাসপাতাল সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশে স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়ানো সম্ভব। শুধু চিকিৎসক নয়, সবাইকে কাজ করতে হবে। রোগী ও তার পরিবারকে গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই সঠিকভাবে পরামর্শ দিতে হবে। বোঝাতে হবে যে, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সময় প্রয়োজন হতে পারে। ইনডাকশন সম্পর্কে তাদের ভয় ও ভুল ধারণা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে দক্ষ প্রসবসেবা দল গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ এবং নবজাতকের চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাফল্যের অর্থ নিরাপদ মা ও নিরাপদ শিশু আমি কখনোই মনে করি না, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত  ‘যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক প্রসব করাতেই হবে।’ আবার শুধু সময় কম লাগবে বা অপেক্ষা করতে হবে না বলে সিজারিয়ান সেকশনকেও প্রথম পছন্দ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। আমি চাই, যে মায়ের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদ এবং সম্ভব, তাকে আমরা সেই সুযোগটুকু দিই। তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিই, মানসিকভাবে প্রস্তুত করি এবং নিরাপদ পরিবেশে পর্যবেক্ষণ করি।

আর যখন মা বা শিশুর নিরাপত্তার জন্য সিজারিয়ান সেকশন প্রয়োজন, তখন অবশ্যই সঠিক সময়ে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার কাছে স্বাভাবিক প্রসব কিংবা সিজারিয়ান কোনোটিই একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি নয়। আমার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো একজন সুস্থ মা এবং একটি সুস্থ শিশু।