অধ্যাপক ডা. আইয়ুব আলী
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
ঠোঁট কাটা ও তালু কাটা জন্মগত ত্রুটি। গর্ভে শিশুর মুখম-লের গঠন তৈরি হওয়ার সময় ঠোঁট ও তালুর কিছু অংশ স্বাভাবিকভাবে একত্রিত না হলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে জেনেটিক ও পরিবেশগত নানা কারণের সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সন্তানকে দোষ দেওয়ার কোনো কারণ নেই, মাকেও নয়। দেশে এর চিকিৎসাও আছে। আর এই চিকিৎসা হলো প্লাস্টিক সার্জারি। প্লাস্টিক সার্জারি মানেই শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর চিকিৎসা এ ধারণাটি আসলে অসম্পূর্ণ। পুনর্গঠনমূলক প্লাস্টিক সার্জারির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জন্মগত ত্রুটি সংশোধন করে শরীরের গঠন ও কার্যকারিতা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক অবস্থার কাছাকাছি নিয়ে আসা।
ঠোঁট কাটা শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠোঁটের দুই প্রান্তকে যথাযথভাবে পুনর্গঠন করা হয়। লক্ষ্য শুধু একটি ফাঁক বন্ধ করা নয়। ঠোঁটের গঠন, পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতা, নাকের আকৃতি এবং ভবিষ্যতের মুখের বিকাশ সবকিছু বিবেচনায় রাখা হয়।
তালু কাটা থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তালু শুধু মুখের একটি অংশ নয়। এটি খাওয়া, গিলতে পারা এবং কথা বলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তালুতে ত্রুটি থাকলে শিশুর খাওয়ানোর সমস্যা হতে পারে, নাক ও মুখের মধ্যে অস্বাভাবিক যোগাযোগ তৈরি হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে কথা বলার বিকাশেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই তালু কাটা শিশুর চিকিৎসা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি। একজন প্লাস্টিক সার্জন হয়তো অস্ত্রোপচার করবেন।
কিন্তু শিশুটির পুরো চিকিৎসাযাত্রায় আরও অনেক বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হতে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, দন্ত ও অর্থোডেন্টিক বিশেষজ্ঞ, নাক-কান-গলারোগ বিশেষজ্ঞ, স্পিচ থেরাপিস্ট, প্রয়োজনে অন্যান্য বিশেষজ্ঞও। কারণ একটি শিশুকে শুধু দেখতে সুন্দর করে তোলাই চিকিৎসার উদ্দেশ্য নয়। সে যেন খেতে পারে। কথা বলতে পারে। সে যেন শুনতে পারে। তার দাঁত ও চোয়াল যেন স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। সব শেষে যেন আত্মবিশ্বাস নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারে। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। ঠোঁট কাটা ও তালু কাটার আধুনিক চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিচর্যার মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুকেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রতিটি শিশুর সমস্যা এক নয়। তাই সবার চিকিৎসার সময়, অস্ত্রোপচারের ধরন ও চিকিৎসা পরিকল্পনাও এক নয়। শিশুর সার্বিক স্বাস্থ্য, ত্রুটির ধরন এবং মুখম-লের বিকাশ বিবেচনা করেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন কখন এবং কীভাবে চিকিৎসা করা হবে। তাই লোকমুখে শুনে কুসংস্কার বা লজ্জা নয়। প্রয়োজন সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।