২৮ কিমিতে ২০ বাঁক, দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে প্রতিনিয়ত

গাজীপুরের কালিয়াকৈর-মাওনা ২৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়কের সৌন্দর্য আকৃষ্ট করে সবাইকে। দুই পাশে সারি সারি গজারি গাছ সড়কটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। তবে, এসব সৌন্দর্য ছাপিয়ে দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এই সড়কের ২০টি বাঁকে প্রায় প্রতিদিনই ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। গত দেড় বছরে এই সড়কে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় অর্ধশত মানুষ, আহত হয়েছে শতাধিক।

সর্বশেষ গতকাল শনিবার সকালে কালিয়াকৈর থেকে পাঁচজন যাত্রী নিয়ে একটি সিএনজি শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তার দিকে যাচ্ছিল। সিএনজি অটোরিকশাটি কালিয়াকৈর-ফুলবাড়িয়া-মাওনা আঞ্চলিক সড়কের কাঞ্চনপুর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে সিএনজি অটোরিকশার চালক এবং মা-ছেলেসহ চারজন যাত্রীর মৃত্যু হয়। তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিহতরা হলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বংখুরী এলাকার হাসেম মিয়ার স্ত্রী নাসিমা বেগম (৪৫) ও তার সন্তান আসাদুল ইসলাম (১৮)। সিএনজি ড্রাইভার শাকিল ও বাংলাবাজার এলাকার খোকন শিকদার।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কটি দুর্ঘটনাপ্রবণ। প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। শনিবারও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ফুলবাড়িয়া হয়ে যাওয়া যায় শ্রীপুরের মাওনা পর্যন্ত। মাওনা হয়ে ময়মনসিংহে যাওয়া যায় খুব সহজে। আঞ্চলিক সড়ক হলেও এটি ২০ থেকে ২৫ ফুট প্রশস্ত। প্রতিদিন শতশত যানবাহন এই সড়কে চলাচল করে। সড়কটি দিয়ে যাওয়ার সময় ১৮ থেকে ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকে শালবন ও ঝোপঝাড় থাকায় এক পাশ থেকে অন্য পাশের যানবাহন দেখা যায় না। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

কালিয়াকৈর বাজার ব্যবসায়ী কাজীউল ইসলাম রানা বলেন, এই রোডের সিএনজিগুলো খুবই বেপরোয়া চালায়। পাশাপাশি রাস্তা চাপা হওয়ায় ও দুপাশে গাছের জন্য মোড়ের বিপরীতে দেখা যায় না। বড় গাড়িগুলো রাস্তার মাঝ দিয়ে চলতে গিয়ে প্রচুর দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। রাস্তাটি প্রশস্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসী বলেন, মাওনা-কালিয়াকৈর সড়কের দুপাশে গভীর বন থাকায় সামনের যানবাহন কম দেখা যায়। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতি থাকে বেশি। ফলে সড়কের বাঁকে গিয়ে চালকরা গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, ঘটে দুর্ঘটনা। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্রাক সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায় পড়ে। মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে এই সড়কে। মাটি সড়কে পড়ে বৃষ্টির পানিতে তা পিচ্ছল হয়ে যায়। যা দুর্ঘটনার আরও একটি কারণ। নির্জন এলাকা হওয়ায় এই সড়কে ডাকাতের কবলেও পড়তে হয় যাতায়াতকারীদের।

এ সড়ক দিয়ে চলাচলকারী পরিবহন চালকরা বলছেন, সড়কে বিভিন্ন যানবাহন ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে চলে। ইচ্ছা করলেই গাড়ি হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। বাঁকগুলো এত ভয়ংকর যে এক পাশ থেকে অন্য পাশ দেখা যায় না। বাঁকগুলোর নির্দেশক সচরাচর চোখেও পড়ে না। ট্রাকচালক জিলহজ আলী বলেন, সড়কে একদিকে বাঁক, অন্যদিকে ঘন জঙ্গল এর মধ্যে এই সড়কে অতিরিক্ত সিএনজি চলাচল করে। সিএনজিগুলো বাঁকে এসেও গতিনিয়ন্ত্রণ করে না। অন্যদিকে ভারী যানবাহনগুলো গতিনিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, সবারই সচেতন হয়ে গাড়ি ছড়ানো উচিত। সড়কের বাঁকে নির্দেশক থাকলেও তা দূর থেকে দেখা যায় না। রাতে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হয় তাদের।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের জেলা সভাপতি রাকিব হাসান বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই আঞ্চলিক সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হবে। আমরা এর আগে এই সড়কে সিএনজি বাদ দিয়ে বাস চলাচলের জন্য মানববন্ধন করি এবং বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিই। তবুও কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা নেয়নি। এই সড়কে প্রতি মাসেই কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে।

জয়দেবপুর সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তারিখ হোসেন বলেন, ওই রাস্তাটি সংকুচিত। ইতিমধ্যে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান মন্ত্রণালয়ে রাস্তাটি সম্প্রসারণের জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন। অত্যধিক বাঁক রয়েছে রাস্তায়, সম্প্রসারণ হলে দুর্ঘটনা কমবে। তবে সম্প্রসারণ করাটাও বেশ জটিল, কেননা এই রাস্তার অধিকাংশ অংশে ফরেস্টের গাছ ও জায়গা রয়েছে।

এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সমস্যা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম শরিফুল আলম।