বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং সাউথ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত জোট, ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন। এটি ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলন। যতটুকু জানা গেছে তাতে পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরিসরে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে চীনের প্রধানমন্ত্রী এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট যোগ দেবেন বিশাল প্রতিনিধিদল নিয়ে। আয়োজক দেশ হিসেবে থাকবে ভারত এবং তাদের বিশাল প্রতিনিধিদল। এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন এক অনন্য মাত্রা পাবে বলেই অনেকের প্রত্যাশা। প্রতিষ্ঠার পর ব্রিকসের যতগুলো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বছর দুয়েক আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনটি ছিল বেশ বড় পরিসরের। আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকা সম্মেলনকে ছাড়িয়ে যাবে।

ব্রিকসের আনুষ্ঠানিক যাত্রার পর প্রায় দেড় যুগ অতিক্রান্ত হলেও এই জোট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনো সেভাবে অবস্থান তৈরি করে নিতে পারেনি। বিশেষ করে যে পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে এই জোট গঠিত, সেই পশ্চিমা বিশ্বেকে এই জোটের পথচলা মোটেও নাড়া দিতে পারেনি। বছর তিনেক আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাবিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে বিশ্বের অনেক দেশ, বিশেষ করা যারা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় ডলার নির্ভর, তারা সমস্যায় পড়ে যায়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ডলার হিসাব জব্দ এবং সুইফট থেকে বহিষ্কারের মতো অর্থনৈতিক অস্ত্র আমেরিকা এবং পশ্চিমাবিশ্ব যেভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, তা দেখে বিশ্বের অনেক দেশই ভাবতে শুরু করে যে এসব অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। এ রকম অনিশ্চয়তার কারণেই ব্রিকসের অগ্রযাত্রা নতুন মাত্রা পায় এবং এই জোটকে কার্যকর করে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হয়। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন প্রথমবারের মতো পশ্চিমাবিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকাকে কিছুটা হলেও ভাবিয়ে তুলেছিল। সেই থেকেই ব্রিকস জোটের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর মধ্যে যোগ হয় ট্রাম্পের একতরফা উচ্চশুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্যযুদ্ধের ঘোষণা, যা ব্রিকস জোটকে এগিয়ে নেওয়ার পথকে যথেষ্ট সুগম করে তুলেছে। 

ব্রিকস জোটের আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বরাজনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাছাড়া আমেরিকার একতরফা উচ্চশুল্ক আরোপের কারণে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিক সংকট, পশ্চিমাবিশ্বের আধিপত্য, ডি-ডলারাইজেশন, ডলার-নির্ভর অর্থব্যবস্থার অপব্যবহারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এই সম্মেলনে আলোচনা হবে। তবে ব্রিকসের একক মুদ্রা প্রচলন এবং ডলার-নির্ভর অর্থব্যবস্থার বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। আমেরিকাকেন্দ্রিক অর্থব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকা এবং আমেরিকার মুদ্রা ডলারের ওপর অতিনির্ভরশীলতা যে বিশ্বঅর্থনীতির জন্য কতটা হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, তা এখন অনেক দেশই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছে। আর এ কারণেই ব্রিকস জোটের গুরুত্ব বেড়েছে। এই গুরুত্বের বিষয়টি সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও, অনেক দেশ বুঝতে পরেছে, যা জোটকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। 

ব্রিকস যে লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছে এবং তারা যদি সফল হয়, তাহলে ব্রিকস জোট হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ন্যাটোর বিপরীতে সবচেয়ে বৃহত্তম জোট। তবে ন্যাটোর সঙ্গে ব্রিকসের কিছু সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। ন্যাটো প্রকাশ্যে ঘোষিত একটি সামরিক জোট, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করা। পক্ষান্তরে ব্রিকস হচ্ছে প্রকাশ্যে ঘোষিত অর্থনৈতিক জোট, যদিও অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হতে পারে ন্যাটোর বিস্তার রোধ করা। ব্রিকস হতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী এক সংস্থা, যেখানে লাতিন আমেরিকা, ইউরোপের কিছু অংশ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এশিয়ার অনেক দেশ থাকবে। অনেক দেশই বুঝতে পেরেছে যে বিশ্ববাণিজ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হলে ডলারের একক প্রাধান্য এবং আমেরিকাকেন্দ্রিক অর্থব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সেই বিবেচনায় ব্রিকস জোটের অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীর অধিক সময় ধরে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আমেরিকান ডলার যেভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে এবং আমেরিকাকেন্দ্রিক অর্থব্যবস্থা যেভাবে জেঁকে বসে আছে, তার বিপরীতে কোনো মুদ্রা বা বিকল্প অর্থব্যবস্থা দাঁড় করাতে ব্রিকস কতটা সফল হবে। ব্রিকস যদি সত্যিকার অর্থে পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে গড়ে ওঠা জোট হয়, তাহলে আমেরিকার মতো এক শক্তিশালী দেশকে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হবে। সেই প্রেক্ষাপটে চীন হয়তো এই দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু চীনকে তো সে রকম দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। চীনের সঙ্গে ভারতের কিছু দ্বিপাক্ষিক সমস্যা আছে, যা ব্রিকস প্রকৃত অর্থে কার্যকর করার লক্ষ্যে বৃহত্তর স্বার্থে সরিয়ে রাখা বা মিটিয়ে ফেলা প্রয়োজন।  

ভারতকে সক্রিয় ভূমিকায় না নিয়ে এই জোটের সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা ভারত তখন নিজের স্বার্থেই আমেরিকাসহ পশ্চিমাবিশ্বের সঙ্গে থাকবে। আমেরিকা এবং পশ্চিমাবিশ্ব থেকে দূরে সরে ব্রিকস জোটে যোগ দেওয়ার কারণে সাইডলাইনে পড়ে নিজেদের গুরুত্বহীন করে তোলার মতো ঝুঁকি ভারত নিশ্চয়ই নেবে না। এসব কারণে ভারতের সক্রিয় ভূমিকা এবং সহযোগিতা ছাড়া ব্রিকসের চলার পথ সহজ হবে না। মোটকথা ন্যাটোর আদলে চীন যদি ব্রিকস জোটে আমেরিকার মতো শক্তিশালী নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকতে চায়, তাহলে রাশিয়া এবং ভারতকে থাকতে হবে ব্রিটেন এবং জার্মানির মতো ভূমিকায়। একইভাবে আরও অনেক দেশ, যারা এই জোটে যোগ দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে দিতে আগ্রহী, তাদেরও ফ্রান্স, ইতালি এবং কানাডার মতো ভূমিকা নিতে হবে। তাছাড়া ব্রিকসের একক মুদ্রায় লেনদেন করার ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিবাদ বা জটিলতা নিরসন হবে কীভাবে, সেটি একটি বিষয়। আমেরিকায় যেমন আছে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, যার অধীনে যে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বিচার চাইতে পারে এবং বিচার পেয়েও থাকে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভুল বোঝাবুঝি এবং বিবাদ বেশ নিয়মিত ঘটনা।

একক মুদ্রা চালু এবং বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আগে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আঞ্চলিক আদালত বা বিবাদ নিষ্পত্তি কেন্দ্র গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশ্বে রাজনীতি যেভাবে জটিল আকার ধারণ করছে, তাতে ব্রিকস বিশ্বে শক্তিশালী বিকল্পব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। সেটা হয়তো এখনই হবে না। এ জন্য সময় লাগবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা অর্থব্যবস্থা গড়ে উঠতে প্রায় পঞ্চাশ বছর সময় লেগেছিল। তাই ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র যদি আন্তরিকতা, সদিচ্ছা এবং অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে এই জোট ভালো অবস্থানে যেতে পারবে। তবে এ জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন আছে।

প্রথমত, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি সর্বোচ্চ মাত্রার ঘোষণা এবং অঙ্গীকারনামা থাকা প্রয়োজন, যা সবরকম রাজনৈতিক এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে। দ্বিতীয়ত, সদস্য দেশ, বিশেষ করে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি ব্রিকস গভর্নিং বডি গঠিত হতে পারে, যাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে এবং সব সদস্য রাষ্ট্র মেনে চলতে বাধ্য থাকবে, তাতে যদি সেই সিদ্ধান্ত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিপক্ষেও যায়। তৃতীয়ত, চীন, ভারত এবং রাশিয়াসহ অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি ব্রিকস আদালত গঠন করা যেতে পারে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি হবে এবং এই আদালতের রায় প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র মেনে চলতে বাধ্য থাকবে এবং এ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ থাকবে না। চতুর্থত, ব্রিকস ব্যাংককে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো শক্ত ভূমিকা নিতে হবে এবং সব সদস্য দেশের অর্থ রিজার্ভ হিসেবে জমা রাখবে এবং লেনদেন নিষ্পত্তিতে পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনা করবে। পঞ্চমত, চীন, ভারত এবং রাশিয়ার বড় বড় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা থাকতে হবে, যার অধীনে প্রত্যেক দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সদস্য রাষ্ট্রের, বিশেষ করে চীন, ভারত ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে পারেন, যেমনটা আছে আমেরিকা, কানাডা এবং ইউরোপে। সেখানে সব দেশের নাগরিক সব দেশের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ পান।

শক্তিশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কই পারে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ছোটখাটো বিরোধ থেকে দূরে রাখতে। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বের অলিখিত অর্থনৈতিক জোট যে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববাণিজ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে, তার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এসব দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যকার শক্তিশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। ট্রাম্পের একতরফা উচ্চশুল্ক আরোপের কারণে সেই বাণিজ্যিক সমঝোতা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। এসব বিষয় নিশ্চয়ই আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা হবে। ব্রিকস যদি এসব বিষয় সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে ব্রিকস পশ্চিমা অর্থনীতির বিকল্প জোট হিসেবে সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখক : সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

Nironjankumar_roy@yahoo.com