বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা

চলমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন হিসেবে বিষয়টি উত্থাপন করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘টাক্সফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে সরকারের কাছে কোনো ‘ক্রেডিট’ না চেয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিম দিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিগত ১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ ছয় মাসে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবে সংকট সমাধানে সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। চলমান ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ নেই। ভুল নীতি ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাবেও বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের সুস্পষ্ট স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে শহর ও গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে শত শত শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হচ্ছে। উৎপাদন ও রপ্তানি হ্রাস পাওয়ায় দেশের সার্বিক অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলা, শিল্প-বাণিজ্য রক্ষা এবং বেকারত্ব রোধে সরকারের পদক্ষেপ ও করণীয় নির্ধারণে বিষয়টি সংসদে অবিলম্বে আলোচনার দাবি রাখে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই সংকট মোকাবিলায় মুখের আশ্বাস নয়, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। তিনি বলেন, সংসদে মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ ও ভুতুড়ে বিল বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এসব সমস্যা রয়ে গেছে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে যত ভালো পরিকল্পনাই করা হোক, তা ব্যর্থ হবে।

বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে বিরোধী দল। প্রয়োজন হলে বিরোধী দলের টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সরকার কাজে লাগাতে পারে। এখানে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিটের বিষয় নেই। প্রয়োজন হলে সব কৃতিত্ব সরকার নিক, তারা শুধু সংকটের সমাধান চান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। বিগত দিনে গ্যাসের উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যবস্থা আগের সরকারের রেখে যাওয়া। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে নতুন করে যে তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেখানে ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অনুগত টাইকুনদের লালন-পালন করতে গিয়ে বিদেশনির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছিল এবং কোনো প্রকার দেশীয় অনুসন্ধানে নজর দেয়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, দেশে বর্তমানে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দৃশ্যমান, তা পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনারই ফল।

বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পুরনো চুক্তি রাতারাতি বাতিল করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চুক্তি বাতিল করলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ধৈর্য নিয়ে এগোতে হবে।

চলমান ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ১০৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির কাজ চলছে। গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই দুটি নতুন এফএসআরইউর চুক্তি এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর বর্তমান সরকারের মেয়াদেই ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ হবে। এতে পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।

মিটার ভাড়া পুরোপুরি মওকুফে ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রুফটপ সোলারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে আগামী বছর পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে সংকট থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণের দয়া নয়, তাদের অধিকার। জনগণ বিল ও কর দেয়; তাই ঘরে আলো জ¦লা ও চুলায় আগুন থাকা তাদের অধিকার। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও বকেয়া, জ্বালানি সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদকদের কাছে সরকারের বিপুল বকেয়া থাকায় অনেক কেন্দ্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে পারছে না। একই সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জের নামে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ চলছে। এসব চার্জ বন্ধের পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি সেল গঠন, বকেয়া বিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং শিল্প-কারখানাকে সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দিতে হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিও বর্তমান সংকটের জন্য আগের সরকারের আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেছেন। তবে শুধু আমদানি করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।