'পাকিস্তান ক্রিকেটে স্থায়ী দর্শন নেই, সকালের সিদ্ধান্ত বিকেলে বদলে যায়'

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে প্রথম দুই ম্যাচে ধরাশায়ী হওয়ার পর মাঝপথেই বোর্ডের অভাবনীয় সিদ্ধান্তে কার্যত কোণঠাসা পাকিস্তান ক্রিকেট দল। মোহাম্মদ রিজওয়ান, ইমাম-উল-হক, সালমান আলী আগাসহ সাতজন ক্রিকেটার এবং প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকে সফর চলাকালীনই দেশে ফেরত পাঠিয়েছে পিসিবি। এজবাস্টনে শেষ টেস্টের আগে পুরো দলের এমন খোলনলচে বদলে ফেলা এবং অধিনায়ক বাবর আজমকে পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার ঘটনায় পাকিস্তান ক্রিকেটে তৈরি হয়েছে চরম এক অরাজক পরিবেশ।

এমন অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে নিজের চরম অসহায়ত্ব ব্যক্ত করেছেন সাবেক অধিনায়ক ও পিসিবি চেয়ারম্যান রমিজ রাজা। বিবিসি-র 'টেস্ট ম্যাচ স্পেশাল'-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে বোর্ডের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিকতা তিনি খুঁজে পাননি।

সফররত দল থেকে এতজন ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া ও নতুন সাতজনকে হঠাৎ উড়িয়ে আনার বিশৃঙ্খলা নিয়ে রমিজ রাজা বলেন, "সত্যি বলতে, এটি নজিরবিহীন। আমি জানি না কীভাবে এটিকে সমর্থন বা ব্যাখ্যা করব, কারণ এটি করার কোনো সুযোগ নেই; এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তবে পরিস্থিতি আপনাদের সামনেই রয়েছে, আর আমি কেবল আশা করতে পারি যে খেলোয়াড়রা যা করা দরকার সেটির সাথে মানসিকভাবে মানিয়ে নিতে পারবে।"

পাকিস্তান ক্রিকেটের চিরচেনা খামখেয়ালি মানসিকতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও যোগ করেন, "পাকিস্তান ক্রিকেটে কোনো স্থায়ী দর্শন নেই। এখানে সকালের সিদ্ধান্ত বিকেলে বদলে যায়, আর বিকেলের সিদ্ধান্ত রাতে।"
 
লর্ডস টেস্টের পর জ্বরে আক্রান্ত বাবর আজম যখন সুস্থ হচ্ছিলেন, তখনই গণমাধ্যম ও স্বজনদের মাধ্যমে জানতে পারেন তাঁর স্কোয়াডের বড় অংশকে বিদায় করা হয়েছে। বোর্ডের পক্ষ থেকে অধিনায়ককেই জানানো হয়নি এমন চরম সিদ্ধান্ত। বাবরের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে রমিজ বলেন, "বাবর আজমের জন্য এটি একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ হতে চলেছে। সম্ভবত তাঁর চারপাশে কী ঘটছে সে সম্পর্কেও তিনি কিছুই জানতেন না। আর একজন অধিনায়কের জন্য আত্মীয়স্বজন বা সংবাদমাধ্যম থেকে এই ধরনের খবর শোনা অত্যন্ত হতাশাজনক।"

রমিজ মনে করেন, অধিনায়কের হাত শক্ত না করলে পিসিবির এই আচরণ দলকে দিন দিন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। অধিনায়কত্ব ও দলের চালিকাশক্তি প্রসঙ্গে তাঁর স্পষ্ট কথা, "বাবর আজম আমাদের ক্রিকেটের পোস্টার বয়। কিন্তু অধিনায়কত্ব এমন এক জিনিস, যা আপনাকে শিখতে হয় আগুনে পুড়ে। তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা না দিলে সে কখনোই অধিনায়ক হিসেবে পরিণত হতে পারবে না। অধিনায়ককে ক্ষমতা দিতে হবে; বোর্ডের কাজ ব্যাকস্টেজে থাকা, দলের সব সিদ্ধান্ত অধিনায়ক এবং কোচের হাত ধরেই আসা উচিত।"

পিসিবি চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে রমিজ রাজা স্মরণ করিয়ে দেন, ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা নড়বড়ে। পিসিবির অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "পিসিবির চেয়ারম্যান হওয়া আর একটি জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর বসা একই কথা। এখানে আপনাকে প্রতি মুহূর্তেই নাটকীয়তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এমন একটি জায়গা, যেখানে কোনো কিছু গড়ার জন্য চার বছর দরকার হয়, আর ভেঙে ফেলার জন্য চার মিনিটই যথেষ্ট।"

বোর্ডের পেশাদারত্বের অভাবকে কাঠগড়ায় তুলে তিনি কঠোর মন্তব্য করেন, "আমাদের ক্রিকেটে আবেগ অনেক বেশি, কিন্তু পেশাদারিত্বের প্রচণ্ড অভাব। যতক্ষণ না আমরা আবেগ সরিয়ে মেধা ও পরিকল্পনাকে প্রাধান্য দেব, আমরা বিশ্বমানের দল হতে পারব না।"
 

মাঠের পারফরম্যান্স ও মানসিকতার সংকটে ভবিষ্যৎ


প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি মাঠের কৌশলগত ভুল ও ক্রিকেটারদের আত্মতুষ্টিকেও দলের অবনতির জন্য দায়ী করেন এই সাবেক তারকা। তাঁর মতে, "যে খেলোয়াড় দেশের জন্য ১০০ শতাংশের কম দেয়, তার জাতীয় দলে থাকার কোনো অধিকার নেই। জাতীয় দলের জার্সিটা এত সহজে পাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানে কেবল ছক্কা মারা নয়, ম্যাচ জয়ের জন্য পরিস্থিতি বোঝা অত্যন্ত জরুরি; আমাদের ব্যাটারদের ডট বল কমানোর কৌশল শিখতেই হবে। এছাড়া ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষকে অলআউট করার জন্য যে আক্রমণাত্মক মনোভাব লাগে, আমরা আজকাল পিচ বানানোর সময় সেটাই হারিয়ে ফেলছি।"

সিরিজের মাঝপথে এই তুলকালাম কান্ড প্রমাণ করে দিয়েছে যে, মূল সমস্যা কেবল ক্রিকেটারদের অফ-ফর্মে নয়, বরং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের মূল চালিকাশক্তিতেই ধস নেমেছে। রমিজ রাজার মতে, বোর্ডের নিজস্ব জটিলতা ও যোগাযোগহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির ক্রিকেট দলে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান।