প্যারিসের বাস্তিল চত্বরে বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা

ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা প্যারিসের ঐতিহাসিক বাস্তিল চত্বরে শৈল্পিক সৌন্দর্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা। বিশ্বশান্তি, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই ফ্যাশনের বার্তা নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকাও পেয়েছে বিশেষ স্থান। 

প্যারিসের প্লাস দ্য লা বাস্তিল প্রাঙ্গণে আয়োজিত লা রপ্রিজ দ্য লা বাস্তিল প্রদর্শনীতে ১৯৬টি পতাকা শৈল্পিকভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। ঐতিহাসিক কোলন দ্য জুয়ে ঘিরে বৃত্তাকারে সাজানো পতাকাগুলো দূর থেকেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তবে এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পতাকার গুরুত্ব শুধু জাতীয় পরিচয়ের কারণে নয়, এর নির্মাণশৈলীও আলাদা করে নজর কাড়ছে। পতাকাটি তৈরি করা হয়েছে পুরনো ও পরিত্যক্ত টেক্সটাইল কাপড় পুনর্ব্যবহার করে। ফেলে দেওয়া কাপড়কে নতুনভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত নান্দনিকভাবে।

বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে এই শিল্পকর্মের সম্পর্কও প্রতীকী। বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে সামনে রেখে পোশাকশিল্পের বর্জ্য কাপড়কে পুনর্ব্যবহার করে জাতীয় পতাকা তৈরির উদ্যোগটি দেশের টেক্সটাইল ঐতিহ্য এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের একটি শিল্পিত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। পতাকার কাপড়ের বুনন, লাল-সবুজের বিন্যাস এবং পুনর্ব্যবহৃত টেক্সটাইলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য একে প্রচলিত কাপড়ের পতাকার চেয়ে ভিন্ন একটি শিল্পরূপ দিয়েছে। সামাজিক সংস্থা ‘হুরিয়া’র কারিগরদের হাতে সেলাই করা এই পতাকায় বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে পুনর্ব্যবহার ও টেকসই উৎপাদনের ধারণা। আয়োজকদের উদ্যোগে প্রতিটি দেশের পতাকা তৈরিতে পুরনো ও ফেলনা টেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রতিটি পতাকা একই সঙ্গে একটি দেশের পরিচয় এবং পরিবেশ রক্ষার বার্তা বহন করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির সঙ্গে পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

প্রদর্শনীটির মূল ভাবনা বিশ্বশান্তি ও টেকসই ফ্যাশনকে একই শিল্পমঞ্চে তুলে ধরা। ফরাসি শিল্পী জুটি ‘ক্ল্যার এ জঁ-সেব গণমাধ্যম সংস্থা ফেস্তিভাল দ্যু মোঁদ এবং পরিবেশবান্ধব সংস্থা ‘রিফ্যাশন’ যৌথভাবে এ উদ্যোগ আয়োজন করেছে। প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা কেবল একটি জাতীয় প্রতীক হিসেবে নয়, বরং টেকসই টেক্সটাইল শিল্পের সম্ভাবনারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফরাসি বিপ্লবের স্মৃতিবাহী বাস্তিল চত্বরে বাংলাদেশের পতাকার এই শৈল্পিক উপস্থিতি তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও তৈরি করেছে গর্ব ও আনন্দের অনুভূতি। প্রদর্শনী শেষে পতাকাগুলো আন্তর্জাতিক অনলাইন নিলামের মাধ্যমে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ থেকে সংগৃহীত অর্থ পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই বস্ত্র আন্দোলনে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাস্তিলের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে লাল-সবুজের এই উপস্থিতি তাই শুধু বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রদর্শন নয়। পুরনো কাপড়ের পুনর্ব্যবহার, সৃজনশীল কারুশিল্প এবং টেকসই ফ্যাশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বিশ্বশিল্প ও পরিবেশ আন্দোলনের আলোচনায় নিজের জায়গা করে নিতে পারে, এই পতাকাটি তারই এক নান্দনিক প্রতীক।