ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিশ্ব ফ্যাশন ও টেক্সটাইল শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সোর্সিং মেলা টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিস শরৎ ২০২৬ শুরু হয়েছে।
তিন দিনব্যাপী এ মেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা অংশ নিচ্ছেন। মেলার দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নও উদ্বোধন করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগষ্ট) প্যারিস-লে বুর্জে প্রদর্শনী কেন্দ্রে মেলার উদ্বোধন হয়। একই দিন বিকেলে মেলার হল-৩-এর বি৩৩০ নম্বর বুথে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের উদ্বোধন করেন ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি খন্দকার এম. তালহা। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ।
এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও প্যাভিলিয়ন পরিচালক মোহাম্মদ রেহান উদ্দিনসহ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডিফেন্স অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান মোল্লা (এনডিসি, পিএসসি), দূতালয় প্রধান মো. ওয়ালিদ বিন কাশেম, কাউন্সিলর মাহফুজা সুলতানা, প্রথম সচিব শেখ মারেফত তারেকুল ইসলাম, মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) মিজানুর রহমান, দ্বিতীয় সচিব কে. এফ. এম. শারহাদ শাকিলসহ অন্যান্য কর্মকর্তা।মেসে ফ্রাঙ্কফুর্টের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এবারের মেলায় প্রায় ৩৫টি দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ নির্মাতা ও সরবরাহকারী অংশ নিচ্ছেন। প্যারিস-লে বুর্জে প্রদর্শনী কেন্দ্রের ২, ৩ ও ৪ নম্বর হলে টেক্সওয়ার্ল্ড, অ্যাপারেল সোর্সিং ও অ্যাভানটেক্সের বিভিন্ন আয়োজন চলছে।
মেলায় টেক্সটাইল ও কাঁচামাল থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক, ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ, টেকসই উপকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান প্রদর্শন করা হচ্ছে। তুলা, ডেনিম, নিট ফেব্রিক, লিনেন, সিল্ক, উল, স্পোর্টসওয়্যার ও কার্যকরী কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তুলে ধরছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্মাতারা।
অন্যদিকে অ্যাপারেল সোর্সিং অংশে নারী, পুরুষ ও শিশুদের পোশাক, ক্যাজুয়াল ও স্পোর্টসওয়্যার, নিটওয়্যার, আউটারওয়্যার এবং ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ প্রদর্শিত হচ্ছে। এবারের মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
ইপিবির উদ্যোগে ১২টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরও পাঁচটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) মিজানুর রহমান।
অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠান মেলায় নিজেদের পণ্য ও উৎপাদন সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরছে।
প্যারিসের এই মেলা বাংলাদেশের জন্য শুধু পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ নয়, বরং ইউরোপের বড় ক্রেতা ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা নতুন ক্রেতা খোঁজা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি এবং ইউরোপের বাজারে নতুন পণ্য ও উচ্চমূল্যের পোশাকের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্বের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য, দ্রুত ডেলিভারি, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের মান, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং শ্রমিক অধিকার এখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন উৎপাদন উৎসের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রবণতাও বাড়ছে।
এই পরিবর্তিত বাজার বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে যেমন বড় সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে কঠিন প্রতিযোগিতাও। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান শক্তিশালী হলেও উৎপাদন ব্যয়, দ্রুত সরবরাহ, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে শুধু কম দামে বড় পরিমাণে পোশাক সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। ক্রেতারা এখন মানসম্মত পণ্য, দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকেও প্রচলিত উৎপাদন কাঠামোর বাইরে গিয়ে পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে হচ্ছে।এ ক্ষেত্রে নিটওয়্যার, ডেনিম, স্পোর্টসওয়্যার, আউটারওয়্যার, টেকনিক্যাল ও কার্যকরী পোশাকের পাশাপাশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, অটোমেশন ও নতুন উৎপাদন পদ্ধতির ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
প্যারিসের মেলাটিতে টেকসই ফ্যাশন ও প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অ্যাভানটেক্স অংশে স্মার্ট ম্যাটেরিয়াল, সার্কুলার ফ্যাশন, অটোমেশন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং নতুন প্রযুক্তির বিভিন্ন সমাধান প্রদর্শন করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল, পুনর্ব্যবহৃত ফাইবার এবং দায়িত্বশীল উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আগ্রহও মেলায় স্পষ্ট।
এবারের মেলায় ইউরোপের কাছাকাছি উৎপাদন উৎস বা নিয়ার সোর্সিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তুরস্ক, সার্বিয়া, রোমানিয়া ও পর্তুগালেরপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বিশেষ হাব তৈরি করা হয়েছে। দ্রুত পণ্য সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং ইউরোপীয় বাজারের চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কাছাকাছি উৎপাদন উৎসগুলোর সুবিধা রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বড় শক্তি হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে পোশাক উৎপাদনের অভিজ্ঞতা, দক্ষ শিল্পভিত্তি এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক। এ কারণে ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এবং আরও সম্প্রসারণ করতে পণ্যের মান, ডিজাইন, প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য ইউরোপের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে চাপ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ক্রেতা ও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় প্যারিসের টেক্সওয়ার্ল্ড মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বিশ্ব ফ্যাশনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র প্যারিসে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান এবং নতুন পণ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়লে আন্তর্জাতিক মেলায় বাংলাদেশের দৃশ্যমানতাও বাড়বে। একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে শুধু প্রচলিত পোশাক নয়, উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।সব মিলিয়ে প্যারিসের টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলা বাংলাদেশের জন্য নতুন ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদার খোঁজার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ কত দ্রুত প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, টেকসই উৎপাদন ও দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থায় নিজেদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে, তার ওপরই ইউরোপের বাজারে ভবিষ্যৎ সাফল্যের বড় অংশ নির্ভর করছে।