পরিচয়ের পৃথিবী

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কুমারের হাতে ভেজা মাটি, পাশে ঘুরছে চাকা। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন ঠিকই, কিন্তু তার পরিচয় লুকিয়ে নেই চোখে; বরং তা ছড়িয়ে আছে আঙুলের নরম কাদায়, মাটির কলসিতে, কর্মশালার আলো-আঁধারিতে। সেই মুহূর্তে আমরা অনুভব করি কখনো কখনো একজন মানুষের মুখের চেয়ে তার চারপাশের চেনা জগৎটাই তাকে চিনিয়ে দেয় আরও স্পষ্টভাবে। আলোকচিত্রের ভাষায় একজন মানুষকে তার পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চেনার এই গল্পই পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতি বা এনভায়রনমেন্টাল পোর্ট্রেট।

আলোকচিত্রশিল্পের এই আঙিনায় ছবির মূল বিষয় মানুষ হলেও তার চারপাশের পরিবেশ নিছক একটি ব্যাকগ্রাউন্ড নয়। বরং সেটিই হয়ে ওঠে তার নিবিড় সহচর। একজন জেলের জাল ছবির ভেতর নদীর গন্ধ নিয়ে আসে। কৃষকের ধানক্ষেত বাতাসের শব্দ শোনায়। কামারের আগুন বলে তার প্রতিদিনের পরিশ্রমের কথা। শিল্পীর রঙতুলি ছড়িয়ে দেয় সৃষ্টির স্বপ্ন। তখন মানুষ আর তার চারপাশ আলাদা থাকে না; তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই গল্প বলে। একটি প্রতিকৃতি তখন কেবল একজন মানুষকে দেখায় না; দেখায় তার জীবন, জীবিকা, সময়, স্মৃতি আর সম্ভাবনা। পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতি আসলে দেখার অভ্যাসেরই পরিণত রূপ। আলোকচিত্রী শুধু মানুষটিকে দেখেন না; দেখেন আলো কোথায় এসে থেমেছে, জানালার ছায়া কোথায় গিয়ে মিশেছে, কোন দূরত্বে দাঁড়ালে মানুষ আর তার পরিবেশ একই নিঃশ্বাসে ধরা দেবে। কতটুকু ফ্রেম ছবিতে থাকবে, কতখানি ডেপথ অব ফিল্ড পরিবেশকে দৃশ্যমান রেখেও মানুষটিকে আলাদা করে তুলবে এসব ছোট ছোট সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে ছবির ভাষা নির্মাণ করে। কম্পোজিশন তখন কেবল বিন্যাস নয়; হয়ে ওঠে গল্প বলার নীরব ব্যাকরণ।

আমরা যে দৃশ্যকল্প দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম, তার ফ্রেম ছিল অনেকটাই ওয়াইড। অথচ গাবতলির এই শ্রমজীবী নারীর প্রতিকৃতিটি তুলনামূলকভাবে ক্লোজ ফ্রেমের। তবু তার কাজের পরিবেশ ছবির বাইরে রয়ে যায়নি। মাথার ওপর বালুভর্তি ঝুড়ি, সামনে বালুর ঢিবি এই অল্প কয়েকটি উপাদানই বলে দেয় তার জীবিকার গল্প। বিভিন্ন নদীর চর থেকে নৌকায় করে আনা বালু আমিনবাজার ঘাটে নামিয়ে এমন ঢিবিতে জমা করা হয়। সেই শ্রমভূমির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কখনো কখনো পরিবেশকে ওয়াইড এঙ্গেলে দেখানোর প্রয়োজন হয় না; তার সামান্য ইঙ্গিতই মানুষের পরিচয়কে সম্পূর্ণ করে তোলে।

চোখেমুখে পরিশ্রমের ঘাম চিকচিক করছে, অথচ তার হাসিটুকু রয়ে গেছে একেবারে অমলিন। সে হাসি আমার অনুরোধে নয়, কাজের ফাঁকে আচমকা ক্যামেরায় ধরা পড়ার স্বাভাবিক বিস্ময়ে। আমি তখন বেশ খানিকটা দূরে নিচে দাঁড়িয়ে ২২৫ মিলিমিটার ফোকাল লেন্থ ব্যবহার করে ছবিটি তুলছিলাম; কথা বলে কোনো অভিব্যক্তি তৈরি করার সুযোগ ছিল না। তাই এই হাসি সাজানো নয়, বরং জীবনের নিজস্ব ভাষা-পরিশ্রম মানুষের শরীরকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু সততার আলোয় অর্জিত জীবিকা তার মুখের স্বাভাবিক দীপ্তিকে মøান করতে পারে না।

মানুষ যখন নিজের পরিবেশের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত মিথস্ক্রিয়ায় মগ্ন, ছবির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি জন্ম নেয় ঠিক তখন। কারণ পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতির নান্দনিকতা লুকিয়ে থাকে তার স্বাভাবিকতায়। এখানে কৃত্রিম আয়োজনের চেয়ে আন্তরিক উপস্থিতি, আরোপিত ভঙ্গির চেয়ে অনায়াস অভিব্যক্তি এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে জীবনের সত্য অনেক বেশি অর্থবহ। তখন আলো, রঙ, টেক্সচার কিংবা পার্সপেক্টিভ আলাদা আলাদা উপাদান থাকে না; তারা মিলেমিশে একজন মানুষের জীবনের গল্প বলতে শুরু করে।

এই প্রতিকৃতিটি তোলার অভিজ্ঞতাও পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মনে করিয়ে দেয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর, করোনাকালের দীর্ঘ স্থবিরতা কিছুটা শিথিল হওয়ার পর আমরা কয়েকজন উত্তরার দিয়াবাড়িতে গিয়েছিলাম পাখির ছবি তুলতে। তাই সঙ্গে ছিল ১৫০-৬০০ মিলিমিটারের একটি টেলিলেন্স। ফেরার পথে হঠাৎই তুরাগ নদীর আমিনবাজার ঘাটে চোখ আটকে গেল এই মায়াবী দৃশ্যে। যে লেন্সটি মূলত বন্যপাখির জন্য বরাদ্দ ছিল, সেটিই যেন মমতায় জড়িয়ে নিল এই মানবীকে। অনেকের ধারণা, মাঝারি ফোকাল লেন্থ ছাড়া পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতি সম্ভব নয়। আসলে ফ্রেম যতই ক্লোজ হোক, যদি তাতে মানুষের সঙ্গে তার পরিবেশ, পরিচয় আর জীবনের গল্প ধরা পড়ে, তবে সেই ছবিও হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতি।

আমাদের জীবনের গল্পগুলো কখনো কেবল নিজেকে নিয়ে নয়। আমরা মানুষ, স্থান, সম্পর্ক, স্মৃতি, সময় আর স্বপ্নের অসংখ্য স্পর্শে ধীরে ধীরে গড়ে উঠি। তাই একটি অর্থপূর্ণ পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতি শুধু একটি মুখায়বয়ব নয়, সেটি ধারণ করে একটি পৃথিবী, যে পৃথিবীর ভেতরে ধরা পড়ে মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে সুন্দর প্রতিচ্ছবি। পরিবেশনির্ভর প্রতিকৃতিতে মানুষ কখনো নিঃসঙ্গ থাকে না; পরিচয় নিয়ে পাশে দাঁড়ায় তার পৃথিবী।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা