প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের খসড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, খসড়ায় এমন কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, অংশীজনদের মতামত ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে এ বিবৃতি পাঠানো হয়। এতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এ সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার-সম্পর্কিত তিনটি জটিল বিষয়কে এক আইনে অন্তর্ভুক্ত করে তিনটির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আইনে সাইবার অপরাধের সঙ্গে সাইবার সুরক্ষার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রকে একাকার করে ফেলার পাশাপাশি সাইবার জগতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণমূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন, এ ধরনের আইনের আওতাবহির্ভূত এবং বৈশ্বিক উত্তম চর্চার পরিপন্থী।’
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়া আইনটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন, নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘খসড়া আইনটিতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বেশ কিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে টার্গেটেড অপব্যবহার ও বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুন্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে।’
টিআইবির নির্বাহী প্রধান বলেন, “খসড়া আইনে ‘যৌন হয়রানি’ ও ‘সেক্সটর্শন’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে এমন অপেশাদার ও অসম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা প্রকৃত অপরাধকে আড়াল করে অভিযুক্তের সুরক্ষা আর ভুক্তভোগীর অধিকার হরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।”
ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, খসড়া আইনের ধারা ৪৬ (২) এ অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধারা-২৩ এর উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দেশের অখ-তা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষাসহ ‘বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এবং ‘বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার্থে’ ইত্যাদি যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি ও প্রায়োগিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের মর্জিমাফিক হওয়ার কারণে অপব্যবহারের মাধ্যমে ভিন্নমত ও বাকস্বাধীনতাকে ব্যাপক হুমকির মুখে ফেলবে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে বেসরকারি পর্যায়ের ‘তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকারবিষয়ক’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুজনের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। এই দুজন সরকার কর্তৃক মনোনীত হবেন। ফলে ‘সুরক্ষা কাউন্সিল’ সরকারের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন অবস্থায় কোনো প্রকার জবাবদিহিহীনভাবে এ আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম সংশ্লিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই কাউন্সিল গঠনের আহ্বান জানান ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় খসড়া আইনটি ঢেলে সাজানো ছাড়া অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন, নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে, যেখানে জনগণের অভিগম্যতা সরকারের মর্জিমাফিক নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ভিন্নমত দমনসহ মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে।’