এক শয্যায় তিন রোগী

নূর মোহাম্মদের বয়স মাত্র সাত মাস। নিউমোনিয়া, তীব্র জ্বর আর শ্বাসকষ্টে হাঁসফাঁস করছে শিশুটি। নগরীর প্রিপোর্ট এলাকা থেকে আসা এই শিশুর ঠাঁই হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর শয্যায়। তবে একা নয়, একই শয্যায় একই ধরনের নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে আরও দুই শিশু। তিন শিশু ও তাদের মায়েরা মিলে ছয়জন এক শয্যাতেই ঠাঁই নিয়েছেন ।

অন্যদিকে কাপ্তাই থেকে আসা ৯ মাসের যমজ দুই ভাই ইয়াসিন ও ইয়ামিন দুজনেই আক্রান্ত হয়েছে হামে। সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্বাসকষ্ট। একজন হাম থেকে ভালো হলেও অপরজন এখনো ভুগছেন। শয্যা সংকটের কারণে ইয়াসিনকে ২৭ নম্বর শয্যায় রাখা হয়েছে সাত মাস বয়সী আরেক নিউমোনিয়া রোগী আব্দুল্লাহর সঙ্গে। অন্য ভাই ইয়ামিন আছেন একই ওয়ার্ডের ‘হাম কর্নারে’।

চট্টগ্রামে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে শিশুদের নিউমোনিয়া, হামসহ নানা সংক্রামক ব্যাধি। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, মৌসুমি এসব রোগে আক্রান্ত শিশুদের চাপে হাসপাতালটির চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

ওয়ার্ড দুটি ঘুরে ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  হাসপাতালে এখন সবচেয়ে বেশি শিশু ভর্তি হচ্ছে নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত হয়ে। এর পাশাপাশি ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত শিশুও আসছে আশঙ্কাজনক হারে। ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কর্মরত শিক্ষানবিশ চিকিৎসক তাসনুভা মাসুদ বলেন, ‘আমাদের ওয়ার্ডে বর্তমানে হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার রোগী প্রচুর পাচ্ছি।’

ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই : সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীর তীব্র চাপের কারণে চমেক হাসপাতালে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৯০টি শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিল ৩১৬ জন, যা ধারণক্ষমতার সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। ৬৪টি সাধারণ শয্যার প্রায় প্রতিটিতেই দুইয়ের অধিক রোগী। নার্সরা জানান, একই শয্যায় পাঁচজনও রাখা হয়।

৮ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্র আরও ভয়াবহ। মাত্র ২১টি অনুমোদিত শয্যার বিপরীতে এই ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি রয়েছে দুইশর কাছাকাছি। শয্যা পেরিয়ে করিডর থেকে শুরু করে বাইরের চলাচলের পথও রোগীদের বিছানায় পরিণত হয়েছে।

৯ নম্বর ওয়ার্ডে শয্যা না পাওয়া সাড়ে তিন বছরের নিউমোনিয়া আক্রান্ত সুমি আক্তারের বাবা মো. পারভেজ আক্ষেপ করে বলেন, ‘মেয়ের জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছি। কোনো শয্যা পাইনি। নিচে একটা শয্যা পেলেও সেখানে তিনজন রোগী। বসা তো দূরের কথা, দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। মানুষজন আমাদের পা দিয়ে মাড়িয়েই চলে যায়।’

এক রোগ নিয়ে ভর্তি, অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয় : হাম ও নিউমোনিয়ার মতো ছোঁয়াচে রোগীর এমন গাদাগাদি পরিবেশে তৈরি হয়েছে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক বলেন, ২১ জন রোগীর জনবল দিয়ে এখন ২০০ জনের বেশি শিশুকে সামলাতে হচ্ছে। রোগী ও স্বজন মিলিয়ে এই ছোট জায়গায় একসঙ্গে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের ভিড়।

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিউমোনিয়া, হাম, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, মেনিনজাইটিসের রোগীরা পাশাপাশি থাকছে। একটি শিশু একটি রোগ নিয়ে ভর্তি হলেও পাশের সংক্রামক রোগীর কারণে হাসপাতালেই নতুন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’

অন্যদিকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আরেকজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের ওয়ার্ডে ৯০টির মতো শয্যা থাকলেও রোগী ও স্বজন মিলে প্রায় ১ হাজার মানুষের সমাগম হয়। প্রচ- গরম। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। অক্সিজেন সাপ্লাই ঠিকভাবে হচ্ছে না। আর রোগীর সঙ্গে স্বজন আসে দুই থেকে তিনজন। তারা কোনো কথা শুনে না।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘আমাদের এখানে এখন নিউমোনিয়ার রোগী বেশি। অন্য রোগীও আছে। দুই ওয়ার্ড মিলিয়ে ১২০টার মতো শয্যা আছে। কিন্তু রোগী থাকে গড়ে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০। এক শয্যায় তিনজনও দিতে হচ্ছে। কিছু করার নেই।’

তবে শিশু রোগীর চাপ এভাবে বাড়তে থাকলে তা চট্টগ্রামের অন্য সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শিশু রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে কিছু রোগী চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আর জনবল সংকটের বিষয়টিও আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি।’