বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন মেরু

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শুরু হয়েছে বিশ্বের প্রধান উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ‘ব্রিকস’-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা, বাণিজ্য বিরোধ এবং ভূ-রাজনৈতিক জোটের পরিবর্তনের এই সময়ে এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছেÑ ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’। আজ শনিবার শুরু হওয়া এই সম্মেলন আগামীকাল রবিবার শেষ হবে। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পর, ব্রিকস এখন আর কেবল উদীয়মান অর্থনীতির সাধারণ জোটে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক উৎপাদনে নেতৃত্ব দেওয়া একটি বলয়। এমনকি অর্থনীতির নতুন মেরূকরণে এই জোট হয়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী শক্তি। একসময় যাকে ‘ছোট দল’ বলে তাচ্ছিল্য করা হতো, সেই ব্রিকসই এখন বৈশ্বিক জিডিপির জোগানে ছাড়িয়ে গেছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট ‘জি-৭’কে।

২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে চার সদস্যের জোট হিসেবে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই জোটের অবদান ছিল ২০.৪ শতাংশ, যা জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্ধেকেরও কম। কিন্তু নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি এবং উদীয়মান অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণে ব্রিকসের অর্থনৈতিক পরিধি ক্রমশ বড় হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালেই বৈশ্বিক জিডিপির অংশের দিক থেকে জি-৭ জোটকে ছাড়িয়ে যায় ব্রিকস। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপির ৪১ শতাংশ ব্রিকসের দখলে থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে; বিপরীতে, জি-৭ জোটের অবদান নেমে আসবে ২৮ শতাংশে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই জোটের গুরুত্ব ও শক্তির জায়গাগুলো তুলে ধরেছে ভারতীয় সংবাদসাধ্যম এনডিটিভি। বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা ১১ হলেও, এর অর্থনৈতিক শক্তি মূলত চীন ও ভারতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। জোটের মোট জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশই এ দুই দেশ থেকে আসে।  এর মধ্যে চীনের ৪৮.৫ শতাংশ এবং ভারতের ২০.০৭ শতাংশ। ব্রিকসের অর্থনীতিতে রাশিয়ার অবদান ৮.০২ শতাংশ। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ৬ শতাংশ, ব্রাজিলের ৫.০৭ শতাংশ এবং সৌদি আরবের ৩.০২ শতাংশ। ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্রিকস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মোট রপ্তানির ২২ শতাংশ এবং আমদানির ৪১ শতাংশই হয়েছে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য মূলত কয়েকটি দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল। চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও রাশিয়া, এই তিন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ব্রিকসের দেশগুলোর উদ্দেশে ভারতের মোট রপ্তানির ৬৪ শতাংশ এবং এসব দেশ থেকে ভারতের মোট আমদানির ৭৮ শতাংশই আসে এই তিন দেশের মাধ্যমে। এর মধ্যে চীন একাই ভারতের মোট ব্রিকস আমদানির ৪১ শতাংশের জোগান দেয়। এতে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে চীনের প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তা স্পষ্ট হয়।

রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার কারণে ভারতের বাণিজ্যে রাশিয়ার গুরুত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে ভারতের মোট রপ্তানির ৩৯ শতাংশ যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। মূলত মুক্তা, মূল্যবান পাথর ও গয়না রপ্তানির কারণে দেশটির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই জোটের সদস্য দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভারতীয় বসবাস করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ প্রবাসী ভারতীয়ের মধ্যে প্রায় ৮৯ লাখ ৮০ হাজারই ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে বসবাস করেন। যার মধ্যে কেবল আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেই আছেন ৭০ লাখের বেশি ভারতীয়। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় বসবাস করেন। দেশ দুটি মিলিয়ে ৭০ লাখেরও বেশি ভারতীয় সেখানে বসবাস করছেন। ফলে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতীয় প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এই দুই দেশ। ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটিতে প্রায় ১৮ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন।

বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দিকে হেলে পড়ায়, উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থার নতুন রূপ দিতে ব্রিকস আগামীতে আরও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।