ব্যাংক বাঁচে টাকায় নয়, আমানতকারীর বিশ্বাসে

ব্যাংকের জন্য ‘অর্থ’ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যাংকের বড় সম্পদ ‘আস্থা’। কারণ এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়, মানুষের সঞ্চয় ও বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে বিপুল মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি বা বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কও ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারে না। দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে সংস্কার, পুনর্গঠন ও আস্থা পুনঃস্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সময় বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, সাধারণ আমানতকারী কি সঞ্চয় নিয়ে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত বোধ করছেন? কারণ ব্যাংকে জমা থাকা অর্থ, সাধারণ মানুষের কাছে শুধু হিসাবের অঙ্ক নয়। এটি কারও জীবনভর সঞ্চয়, কিংবা সন্তানের শিক্ষার অর্থ, নতুবা অবসরজীবনের নিরাপত্তা। আবার কারও হয়তো ব্যবসার মূলধন বা প্রবাসীর কষ্টার্জিত উপার্জন। একজন আমানতকারী যখন তার অর্থ ব্যাংকে রাখেন, তখন তিনি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন না তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ, নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে আস্থা রাখেন। এ কারণে ব্যাংকিং সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে আমানতকারীর সুরক্ষা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ, প্রভাবশালী মহলের অযাচিত প্রভাব ও পর্যাপ্ত জবাবদিহির অভাব এসব সমস্যা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দুর্বল করে না, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনিয়মের জন্য সাধারণ আমানতকারী দায়ী নন। এর খেসারত যেন তাকে দিতে না হয়। ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে বা পুনর্গঠনের প্রয়োজন হলে, আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। মানুষ তখন জানতে চান তাদের অর্থ কতটা নিরাপদ, কখন অর্থ তুলতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকটির অবস্থা কী হবে? ব্যাংক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে, এর প্রভাব অন্য ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য কিছু সংস্কার জরুরি। 

সংস্কারের মূল লক্ষ্য : প্রথমত, ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে মূলধন, তারল্য, প্রযুক্তি ও আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দরকার কঠোর সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এ জন্য ব্যাংকের আর্থিক তথ্য ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। আমানতকারী ও সাধারণ মানুষ যেন সহজ ভাষায় ব্যাংকের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পান, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা দায়িত্বহীন ঋণ বিতরণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকিং খাত সংস্কারের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হবে তখন, যখন সাধারণ আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অথচ প্রকৃত দায়ীরা জবাবদিহির বাইরে থাকবেন।

তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও পেশাদার করতে হবে। চতুর্থত, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের বিষয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কোনো ব্যাংককে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থার আওতায় আনা হলে আমানতকারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা শুধু সমস্যার ব্যয় না, মানুষের উদ্বেগ বাড়ায়। পঞ্চমত, আমানতকারীর আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ব্যাংক শুধু টাকা রাখার জায়গা নয় : ব্যাংকের গুরুত্ব শুধু আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক হলো একটি দেশের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প ও কর্মসংস্থানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। মানুষ ব্যাংকের ওপর আস্থা হারালে, এর প্রভাব শুধু ব্যাংকে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিনিয়োগ হ্রাস, ব্যবসার অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত, উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা জনগণের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করে প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।  ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে শুধু ব্যাংক রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না এটি জনগণের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রক্ষার উদ্যোগ।

আস্থাই সংস্কারের মাপকাঠি : বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে শুধু সংকট হিসেবে না দেখে  শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এমন একটি ব্যাংকিং সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সুশাসনের কোনো বিকল্প থাকবে না। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা হবে কার্যকর, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতরা জবাবদিহির আওতায় আসবেন এবং সাধারণ মানুষ বৈধ সঞ্চয় নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হবেন না। আমানতকারীরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। তাদের চাওয়া সততার সঙ্গে উপার্জিত অর্থ, যা বিশ্বাস করে ব্যাংকে রেখেছেন,  সেটি নিরাপদ থাকুক। এই বিশ্বাস ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি। ব্যাংকের ভবন বদলানো যায়, নতুন মূলধন আনা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা যায় এবং প্রয়োজন হলে ব্যাংক একীভূত বা পুনর্গঠন করা যায়, কিন্তু মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের সাফল্য শুধু খেলাপি ঋণ কতটা কমল, কতটি ব্যাংক পুনর্গঠিত হলো কিংবা কত টাকা মূলধন বাড়ল এসব দিয়ে মাপা উচিত নয়। আমার টাকা ব্যাংকে নিরাপদ, এই বিশ্বাসই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। মনে রাখতে হবে, ব্যাংক টাকায় চলে ঠিক, কিন্তু টিকে থাকে আমানতকারীর বিশ্বাসে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক