প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস, যাকে চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বলে গণ্য করা হয়। তিনি বলেছেন, ‘যেখানে চিকিৎসাশিল্পকে ভালোবাসা হয়, সেখানে মানবপ্রেমও থাকে।’ হিপোক্রেটীয় চিকিৎসাশৈলী উদ্ভাবনের স্বীকৃতিতে হিপোক্রেটিসকে পশ্চিমী চিকিৎসাশাস্ত্রের পিতা বলে অভিহিত করা হয়। আর আমেরিকান শৈল্য চিকিৎসক উইলিয়াম জেমস মেয়ো যিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত মেয়ো ক্লিনিকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেছেন, ‘চিকিৎসার লক্ষ্য হলো জীবন দীর্ঘ করা এবং রোগ এড়ানো আর চিকিৎসার পূর্ণতা হলো ডাক্তারের প্রয়োজনীয়তা দূর করা।’ তাদের এই উক্তিগুলোর রয়েছে গভীর মর্মবাণী। চিকিৎসাসেবা অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধান শুধু এর স্বীকৃতিই দেয়নি, সেখানে এ ব্যাপারে জোর অঙ্গীকারও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি নিয়ে ১২ সেপ্টেম্বরে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, তা অনাকাক্সিক্ষত-অনভিপ্রেত। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো দুর্লভ। আরও বলা হয়েছে, দেশের বহু মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। যথাযথ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে জীবনঝুঁকিতে রয়েছেন অনেকেই। আমরা জানি, চিকিৎসার ব্যয়ভার সাধারণ মানুষের পক্ষে কতটা দুর্বহ।
এও সচেতন মানুষ মাত্রেই জানা, দেশের চিকিৎসাসেবার মান ও স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা বিবর্ণ। এই পথ কতটা অমসৃণ। মহানগর-নগর-শহরে তো বটেই, উপজেলা পর্যন্ত গজিয়ে উঠেছে মানহীন বহু ক্ষেত্রে অনুমোদনহীন প্রাইভেট ক্লিনিক-হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা, ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে একদিকে দেশে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ ঊর্ধ্বমুখী, অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবার-স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে অন্তহীন ভোগান্তি। মৃত্যুর হারও বাড়ছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এখনো করোনাকালের অনেক ঘটনা মর্মস্পর্শিতার স্মারক হয়ে আছে। দেশের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, সেবিকা, ওষুধ, শয্যা, চিকিৎসা উপকরণ, পরীক্ষা ইত্যাদির সংকটে চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি ভুক্তভোগীদের কাছে যেন ‘সোনার হরিণ’। আমরা দেখছি অসংক্রামক রোগের বাড়তি চাপ দেশে এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, স্ট্রোক ও কিডনি রোগীর হার বাড়ছে। অথচ এসব রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা এখনো ইউনিয়ন ও কমিউনিটি পর্যায়ে তো দূরের কথা, অনেক জেলা সদর হাসপাতালেই সংকুচিত। পাশাপাশি শহরে-গ্রামে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট এবং স্বাস্থ্য বাজেটে সীমিত বরাদ্দ, এগুলোও নতুন সংকট নয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকারে কোনো সরকারেরই ঘাটতি না থাকলেও কার্যত দৃশ্যমান চিত্র নৈরাশ্যজনক যুগপৎ প্রশ্নবোধক।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মূল্যায়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মানে বাংলাদেশ এখনো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আমরা জানি, বর্তমান সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি নির্মূল না করে, দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির পাঠ নিশ্চিত হলে যত উদ্যোগই নেওয়া হোক না কেন, এর আলোর মুখ দেখা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। নিকট অতীতে এক সমীক্ষায় প্রকাশ, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নাগরিকদের একটি বড় অংশ প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছেন। এর অন্যতম কারণ স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে দেশের জনগণকে প্রায় ৬৯ শতাংশ ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হয়। চিকিৎসায় ব্যক্তির পকেটের এই ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। আমাদের অজানা নয়, পতিত রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতও অবকাঠামো নির্মাণ এবং কেনাকাটানির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আমরা স্পষ্টই মনে করি, নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের বিষয়টি যতটা না আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন বিদ্যমান, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকারের বাস্তবায়নে দৃঢ়তা। চিকিৎসাসেবায় যদি মানবিকতার বদলে বাণিজ্য চিন্তা অগ্রগণ্য হয়ে পড়ে তাহলে নিশ্চয় তা ঘৃণ্য এবং প্রতিবিধানের দাবি রাখে। যেটুকু সরকারি সুবিধা আছে তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। আছে আস্থার সংকটও। যাদের বিত্ত আছে তারা দেশের বাইরে যাওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে পারছেন। তবে সেখানেও ‘গলাকাটা’ বাণিজ্য আর যাদের বিত্ত নেই, তারা মানহীন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় বিপন্ন হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সর্বক্ষেত্রে মানবিক সেবা নিশ্চিত করার দাবি আমরা রাখি। সুস্থ মানবসমাজ গড়তে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ খাতের সংস্কার সময়ের দাবি।