সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বিড়াল, অ্যানালগ ঘণ্টা

কালো বিড়াল নিয়ে বাঙালির ভয়টা অদ্ভুত। রাস্তায় সামনে দিয়ে গেলে কেউ থামে, কেউ ফিরে তাকায়, কেউ আবার মনে মনে বলে আজ বুঝি কিছু একটা ঘটবে! কিন্তু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গল্পে কালো বিড়ালটি রাস্তা পার হয়নি; বরং বসে আছে কম্পিউটারের সামনে। আরও মজার ব্যাপার, তাকে খুঁজতে অন্ধকারে যেতে হচ্ছে না, যে ঘরে ফল তৈরি হয়, যে ঘরে কোটি কোটি তথ্য ঢোকে, বের হয় লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, সেই ঘরেই নাকি তার বসবাস। দেশ রূপান্তরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ফল জালিয়াতির ঘটনায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের নাম সামনে এসেছে। এখন প্রশ্নটা তাই শুধু ‘কালো বিড়ালটি কে? ’ নয়; প্রশ্ন হলো আমরা যে ডিজিটাল ব্যবস্থাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে বিশ্বাস করছি, তার পাহারাদার যদি নিজেই দরজা-জানালা খুলে রাখে, তাহলে ফলাফলকে বিশ্বাস করব কীভাবে? চট্টগ্রামের এই ঘটনা তাই কেবল একটি শিক্ষা বোর্ডের গল্প নয়; এটি আমাদের পুরো ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতার দিকে তাকানোর একটি সুযোগ।

ঘটনার বিবরণটি নিছক কয়েকটি নম্বর বদলে যাওয়ার গল্প নয়। ২০২৩ সালের এইচএসসি ফল জালিয়াতি, ২০২৫ সালের এসএসসি পুনঃনিরীক্ষণে ৩২ খাতায় অতিরিক্ত নম্বর ইনপুট এবং সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষায় খাতার নম্বর ও প্রকাশিত ফলের অমিল-ঘটনাগুলোর কেন্দ্র হিসেবে বারবার উঠে এসেছে কম্পিউটার সেন্টার। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জনবল ও দায়িত্ব বণ্টনের এমন একটি কাঠামো, যেখানে কে কোন কাজ করেন, কার হাতে কতটুকু প্রবেশাধিকার আছে এবং কোনো পরিবর্তনের দায় শেষ পর্যন্ত কার এসব প্রশ্নের উত্তরই যেন পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এখানেই চট্টগ্রামের ঘটনাটি জাতীয় আলোচনার দাবি রাখে। কারণ ফল এখন কাগজের খাতা থেকে শুধু পরীক্ষকের টেবিলে তৈরি হয় না; ফল একটি ডেটা প্রসেসিং চেইন পেরিয়ে শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনের এসএমএস, ওয়েবসাইট এবং সার্টিফিকেটে পৌঁছায়। অর্থাৎ একটি নম্বর শুধু নম্বর নয় এটি একটি ডিজিটাল ডেটা অবজেক্ট। সেই ডেটা যদি মাঝপথে বদলে যায়, তাহলে প্রশ্নটি শুধু ‘কে নম্বর বাড়াল?’ নয়; বরং ‘সিস্টেমটি কেন তাকে নম্বর বাড়ানোর সুযোগ দিল?’

কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। জনবল সংকট, দায়িত্বের অস্পষ্টতা ও নিরাপত্তা দুর্বলতার কথা উঠে এলেও, এসবের সঙ্গে ফল জালিয়াতির সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত নয়। কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি রয়েছে, অথচ নম্বর পরিবর্তনের নির্দিষ্ট ব্যবহারকারী হিসাব, তথ্যপ্রবেশের নথি বা প্রযুক্তিগত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কম্পিউটার সেন্টারকে ‘কালো বিড়াল’ হিসেবে চিহ্নিত করা কিছুটা আগাম সিদ্ধান্ত হতে পারে। প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে, তবে সম্ভাব্য দুর্বলতার পাশাপাশি প্রমাণিত তথ্যের দিকটিও আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো  ডেটা ইনটিগ্রেটি-ডেটা যে অবস্থায় তৈরি হয়েছে, অনুমোদিত প্রক্রিয়া ছাড়া সেটি যেন পরিবর্তিত না হয়। জাতীয় পর্যায়ের যেকোনো ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় গোপনীয়তা, তথ্যের অখণ্ডতা এবং তথ্যপ্রাপ্যতা-তথ্য নিরাপত্তার এই মৌলিক তিন স্তম্ভের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে তথ্যের অখণ্ডতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থীর ৭০ নম্বর যদি সিস্টেমে ৮০ হয়ে যায়, অথচ কোথায়, কখন, কার অ্যাকাউন্ট থেকে এবং কোন অনুমোদনে পরিবর্তনটি হলো তার নির্ভরযোগ্য রেকর্ড না থাকে, তাহলে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলেও সেটিকে নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থা বলা কঠিন। চট্টগ্রামের ঘটনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইএসটি) প্রণীত তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুযায়ী সাইবার নিরাপত্তা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যবহারকারীকে তার কাজ সম্পন্ন করার জন্য যতটুকু সিস্টেম অ্যাক্সেস প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আলাদা ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় দায়িত্ব পৃথকীকরণ বা সেপারেশন অব ডিউটিজ। অর্থাৎ যিনি খাতা স্ক্যান করবেন, তার হাতে ফল পরিবর্তনের চাবি থাকার কথা নয়। যিনি ডেটা প্রসেস করবেন, তিনিই যেন নিজের কাজ নিজে অনুমোদন করতে না পারেন। আর যিনি ফল চূড়ান্ত করবেন, তার কাজের ওপর স্বাধীনভাবে আরেকজনের যাচাই থাকা উচিত। এনআইএসটির ভাষায়, এর উদ্দেশ্যই হলো একজন ব্যক্তির হাতে এমন পর্যাপ্ত ক্ষমতা না দেওয়া, যাতে তিনি একাই সিস্টেমের অপব্যবহার করতে পারেন।

প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বোর্ডের সীমিত জনবল ও দীর্ঘদিনের অপারেটরদের কথা উঠে এসেছে। কর্মীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই, যখন প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও অতিরিক্ত সিস্টেম-প্রবেশাধিকার এক হাতে চলে যায়। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত ১৬ বছর ধরে কাজ করা কর্মীদের প্রবেশাধিকার কি নিয়মিত পর্যালোচনা হয়েছে? কে তথ্য দেখতে, পরিবর্তন করতে ও অনুমোদন করতে পারবেন, তা কি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত? সবচেয়ে জরুরি হলো কার্যক্রমের ডিজিটাল রেকর্ড। কোনো নম্বর বদলালে কখন, কার ব্যবহারকারী হিসাব থেকে, কোন কম্পিউটার থেকে এবং কে অনুমোদন করেছেন সিস্টেমের তা জানানোর কথা। তাই তদন্তের প্রশ্ন শুধু ‘কে করেছে?’ নয়; ‘সিস্টেমের রেকর্ড কী বলছে?’ কোনো পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্য রেকর্ড না

থাকাটিও বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা। এখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আরও বড় শিক্ষা আছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ডিজিটাল শিক্ষা নিয়ে তাদের গবেষণায় বলছে, শিক্ষা খাতের ডিজিটাল রূপান্তর মানে শুধু কম্পিউটার বসানো বা নতুন সফটওয়্যার চালু করা নয়। এর সঙ্গে তথ্য ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, বিভিন্ন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগ এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়গুলোও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অর্থাৎ প্রযুক্তি যত আধুনিক হবে, সেই প্রযুক্তিকে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ব্যবস্থাও তত শক্তি শালী হতে হবে। আমাদের বাস্তবতায় অবশ্য সমস্যাটি আরও চমৎকার। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে যাওয়ার কথা বলি, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এখনো ‘ডিজিটাল’ মানে কাগজের কাজ কম্পিউটারে করা।

তাই চট্টগ্রামের তদন্তে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কম্পিউটার সেন্টারের কর্মীদের দিকে তাকালে হবে না। প্রয়োজন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ডিজিটাল প্রক্রিয়ার প্রযুক্তিগত ও তথ্যভিত্তিক নিরীক্ষা-খাতা স্ক্যান করা থেকে শুরু করে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা। কে কোন তথ্য ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছেন, কোন ব্যবহারকারী কখন কী কাজ করেছেন, কোথায় কী পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্তনের অনুমোদন কে দিয়েছেন এবং আগের তথ্যের সংরক্ষিত অনুলিপির সঙ্গে বর্তমান তথ্যের মিল আছে কি না এসবই যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে তথ্য নিরাপত্তার একটি অভিন্ন কাঠামো চালু করা যায় কি না, সেটিও এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে। কারণ আজ চট্টগ্রামের একজন শিক্ষার্থীর নম্বর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; কাল একই প্রশ্ন অন্য কোনো বোর্ডে উঠতে পারে। আজ একটি নম্বর বদলেছে, কাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরি কিংবা বৃত্তির ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে। পরীক্ষার ফল আসলে একটি শিশুর বহু বছরের পরিশ্রমের ডিজিটাল সার্টিফিকেট। সেই সার্টিফিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে ক্ষতিটা কোনো একটি বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারে আটকে থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। বাংলাদেশের স্বনামধন্য পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের সম্মান প্রথম বর্ষে বিগত চার বছর আইসিটি কোর্স পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটুকু জানি, কম্পিউটার নিজে থেকে কারও নম্বর বাড়ায় না; মানুষই তাকে সেই কাজটি করার সুযোগ দেয়। তাই সরকারকে শুধু ‘কালো বিড়াল’ ধরলে হবে না, বিড়াল ঢোকার দরজাটিও বন্ধ করতে হবে। দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের ফল তৈরির ব্যবস্থায় এমন নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে কোনো নম্বর বদলালে তদন্ত কমিটিকে বিড়াল খুঁজতে না হয়।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন প্রকাশের পর কর্র্তৃপক্ষ হয়তো এখন প্রশ্নটির মুখোমুখি কালো বিড়ালটি আসলে আছে, নাকি নেই? অনেকটা শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের মতো। পদার্থবিজ্ঞানের এই বিখ্যাত চিন্তা-পরীক্ষায় একটি বিড়ালকে একটি বন্ধ বাক্সে রাখা হয়; বাক্সটি না খোলা পর্যন্ত তাত্ত্বিকভাবে বিড়ালটি একই সঙ্গে জীবিতও, মৃতও-অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত তার অবস্থার নিশ্চিত উত্তর মেলে না। চট্টগ্রামের ‘কালো বিড়াল’ও যেন এখন তেমনই-তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সে একই সঙ্গে আছে এবং নেই; কম্পিউটার সেন্টারের ভেতরেও, আবার তার বাইরেও। হয়তো কোনো কীবোর্ডের ওপাশে তার থাবার ছাপ আছে, হয়তো নেই। হয়তো কোনো নম্বর বদলেছে, হয়তো বদলায়নি। কিন্তু বাক্সটি খুলে না দেখা পর্যন্ত যেমন শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের ভাগ্য জানা যায় না, তেমনি তদন্তের শেষ পর্দা না উঠলে চট্টগ্রামের ‘কালো বিড়াল’ও রহস্যই থেকে যাবে। শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর তখনো বাকি থাকবে বিড়ালটি যদি সত্যিই থাকে, তার গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত

rajibnandy@cu.ac.bd