এক পেসারের জন্য একজন কোচ!

মেয়েদের এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালের আগে টানা স্পট বোলিং করছিলেন মারুফা আক্তার। ততক্ষণে টসও হয়ে গেছে। অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একাদশের একমাত্র পেসার মারুফা, যার দলের হয়ে প্রথম ওভারেই বোলিংয়ে আসার কথা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পেস বোলিং কোচ আলমগীর কবিরের যেন সেদিকে কোনো হেলদোলই নেই। সেই ম্যাচে ৪ ওভারে ১ উইকেট নিলেও ৪০ রান খরচ করেন মারুফা। অথচ একই টুর্নামেন্টে আগের তিন ম্যাচে ৭ উইকেট নেওয়া এই ডানহাতি পেসার দিয়েছিলেন যথাক্রমে ৯, ২১ ও ৬ রান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে দলের সঙ্গে থাকা এক সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, ‘একমাত্র পেসার হয়েও সে যেভাবে টানা স্পট বোলিং করেছে, তাতে তার শারীরিক শক্তির বেশির ভাগই নষ্ট হয়েছে। তখনই একজন পেস বোলিং কোচের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপরও দেখি বোলিং থামেনি।’

মারুফা এখন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের পেস বোলিং বিভাগের সবেধন নীলমণি। কিছুদিন আগেই চোট থেকে সেরে উঠেছেন। তবু বিশ্রামের সুযোগ নেই। জাতীয় দলে আরেক পেসার ফারিহা ইসলাম তৃষ্ণা থাকলেও নিয়মিত একাদশে সুযোগ পান না। এবার হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে এশিয়া কাপে দলের সঙ্গে যেতে পারেননি। তার বদলি হিসেবে ডাক পাওয়া ফারজানা ইয়াসমিন অভিষেক ম্যাচে মাত্র ১ ওভার বল করে পরের ম্যাচেই বাদ পড়েন। অর্থাৎ বাংলাদেশের পেস বোলিং বিভাগ কার্যত মারুফা-নির্ভর। এই একজন বোলারের জন্যই আছেন একজন পেস বোলিং কোচ। অথচ ফিল্ডিংয়ের জন্য আলাদা কোনো কোচ নেই। বিসিবির নারী বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডারদের উন্নতির দায়িত্বও আলমগীরের কাঁধে।

যদিও ভারতের বিপক্ষে পাঁচটি ক্যাচ মিসের পাশাপাশি একাধিক রানআউটের সুযোগ হাতছাড়া করে এশিয়া কাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও অধিনায়ক জ্যোতির কণ্ঠে ফিল্ডারদের প্রশংসা, ‘আমরা ভালো ফিল্ডিংই করেছি। এই বিভাগেই বাকি দুই বিভাগের চেয়ে ভালো করেছি।’ অথচ গ্রুপ পর্বেও একাধিক ক্যাচ ফসকে গেছে বাংলাদেশের ফিল্ডারদের হাত থেকে। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে তিনটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুটি ক্যাচ ছাড়েন মেয়েরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্য বললেন, ‘মারুফা, স্বর্ণাসহ (আক্তার) কয়েকজন মেয়ে আছে একটু ব্যতিক্রম। অন্যদের দেখে মনে হয়, ক্যাচ ধরার কৌশলই জানে না। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি আমরা হেরেছি ফিল্ডারদের জন্যই। খুবই বাজে অবস্থা ফিল্ডিংয়ের। অনুশীলনে কঠোর পরিশ্রম না করলে এখানে কীভাবে ভালো করবে! ফিটনেসেরও বাজে অবস্থা। বল বাউন্ডারি লাইনে গেলেও দুই রান নিতে চায় না। এভাবে তো একটা দলের উন্নতি সম্ভব নয়।’

এশিয়া কাপে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় অনেকের অভিযোগের তীর জ্যোতির দিকেও। তবে নারী ক্রিকেট বিভাগের এক সদস্য ঢালাওভাবে অধিনায়ককে কাঠগড়ায় তুলতে রাজি নন, ‘শেষ কয়েকটি টুর্নামেন্ট আর সিরিজ বিশ্লেষণ করলে শুধু এশিয়া কাপেই জ্যোতির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন। এবার তার বোলিং পরিবর্তনগুলো কার্যকর হয়নি। তবে পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখবেন, এখনো এই দলের সেরা ব্যাটার সে।’ দলীয় সূত্রের দাবি, প্রধান কোচ সারওয়ার ইমরানের পুরনো ধাঁচের কোচিং নিয়েও খুশি নন বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে বাংলাদেশ দলের যে উন্নতি দেখা যাচ্ছে, সেটিকে শুধু সাম্প্রতিক সময়ের ফল হিসেবে দেখলে হবে না। এর আগেই উন্নতির একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং তার ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান অবস্থাটা এসেছে।’ বিসিবির সাবেক পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিমের একক সিদ্ধান্তেই ইমরানকে মেয়েদের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে দাবি তার, ‘যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন সবাই মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সিদ্ধান্ত সঠিক হোক বা ভুল হোক, সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের প্রতি সবার দায়বদ্ধতা ও আত্মবিশ্বাস থাকে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সেই স্বস্তি বা আনন্দ থাকে না।’

ইমরানের সঙ্গে বিসিবির চুক্তির মেয়াদ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত। নতুন করে আর মেয়াদ বাড়াছে না। জানা গেছে, আসন্ন এশিয়ান গেমস দিয়েই বিসিবির সঙ্গে সম্পর্কের ইতি ঘটবে এই কোচের। এরই মধ্যে নতুন প্রধান কোচ খোঁজার প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ডেভিড হেম্পের সঙ্গে চুক্তির পথে বিসিবি। এর আগে খণ্ডকালীনভাবে বাংলাদেশ নারী দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করা হেম্পের কাজের ধরনে সন্তুষ্ট নারী বিভাগ।