শিক্ষায় বাড়ছে বিপদ

রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট সারতে, প্রেজেন্টেশন স্ল্যাইড, ক্লাস টেস্ট ও গবেষণায় বাড়ছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। রেফারেন্স বই, রিসার্চ পেপার, জার্নাল ও ওয়েবসাইট ঘেঁটে বিশ্লেষণের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছেন এক ক্লিকের সহজ সমাধান। এতে একদিকে পরিশ্রম কম হয় অন্যদিকে সময়ের সাশ্রয় হয়। অনেক সময় এআই বিকল্প শিক্ষকের কাজ করে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে এআই-নির্ভরতা। অতি মাত্রায় এআই-নির্ভরতায় বিপদ বাড়তে পারে বলে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করছেন শিক্ষকরা। তারা বলছেন, এআই শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি দুর্বল করে দিচ্ছে, ক্রিটিক্যাল ভাবনায় পিছিয়ে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও এআইয়ের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা নানা ঝুঁকিতে পড়ছে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগে পড়াচ্ছেন ড. মো. আনিসুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসার আগে শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শিক্ষক, পাঠ্যবই, লাইব্রেরি ও প্রচলিত শিক্ষা-উপকরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তথ্যসংগ্রহ, গবেষণা, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি কিংবা কোনো বিষয় বুঝতে শিক্ষার্থীদের বেশ পরিশ্রম করতে হতো; তবে এতে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ হতো। ঘঁাঁটাঘাঁটি করে তারা যে শিক্ষালাভ করত তা তাদের সমৃদ্ধ করত। এখন এআই এসব সমস্যার সমাধান এক ক্লিকে করে দিচ্ছে। সাবজেক্ট (বিষয়) লিখে সার্চ দিলেই মুহূর্তে সব তথ্য হাজির। এতে শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ কমছে। এআইয়ে অতিরিক্ত নির্ভরতা সৃজনশীলতা, চিন্তাভাবনা ও অ্যাকাডেমিক সততা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

তবে এ শিক্ষক এ কথাও বলেন, ‘বর্তমানে এআই শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। দ্রুত তথ্যানুসন্ধান, কঠিন বিষয় সহজভাবে বোঝা, ভাষা শেখা, লেখালেখি ও গবেষণায় সহায়তা পায় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা পাঠ-পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করা ও মূল্যায়ন করতে এবং শিক্ষার্থীর শেখার দুর্বলতা শনাক্ত করতে এআইকে ব্যবহার করতে পারেন। ফলে শিক্ষা আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সহজলভ্য ও কার্যকরী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

গত জুলাইয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থীদের স্নাতক সম্মান শ্রেণির ৮ম সেমিস্টারের ‘রিসার্চ মনোগ্রাফ’-এর গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। ওই সেশনের কমপক্ষে ১০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক। তারা বলেন, ‘আমাদের ব্যাচের প্রায় সবাই রিসার্চ প্রতিবেদন তৈরিতে এআইয়ের সাহায্য নিই। আমরা টপিক লিখে প্রথমে এআইয়ে সার্চ দিই, এরপর এআইকে বলি আমাদের প্রতিবেদন তৈরি করে দিতে। আমরা যেসব ডেটা সংগ্রহ করেছিলাম মাঠ থেকে তা এআইকে দিয়ে বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন বানিয়ে দিতে বলি। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ২ দিন আগে বিভাগীয় প্রধান জানান, প্লেজিয়ারিজম  হয়েছে কি না বা এআইয়ের কথা হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে কি না তা দেখা হবে। যাদের রিপোর্টে ‘নকল’-এর পরিমাণ ২০ ভাগের বেশি থাকবে তাদের অনুত্তীর্ণ বিবেচনা করা হবে। ফলে সবাই বাধ্য হয়ে নিজেদের মতো এআইয়ের করে দেওয়া রিসার্চকে রিঅ্যারেঞ্জ করে জমা দিই।’ 

বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় নির্ধারণ করে দিতেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে যেতেন, বই ও গবেষণাপত্র খুঁজতেন, তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল বের করতেন, নোট নিতেন। এরপর নিজের ভাষায় যুক্তি সাজিয়ে তৈরি করতেন অ্যাসাইনমেন্ট। এখন সে কাজের বড় একটি অংশ কয়েক মিনিটেই করে দিচ্ছে চ্যাটজিপিটি, জিমেনি, ক্লাউড-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগে একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ের ওপর ১০টি গবেষণাপত্র পড়ে, নোট নিয়ে, গবেষণাগুলোর মিল-অমিল খুঁজে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন। এখন একজন শিক্ষার্থী এআইকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ১০টি গবেষণাপত্রের মূল বক্তব্য বের করে একটি লিটারেচার রিভিউ তৈরি করে দাও’। এখন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পড়া, তুলনা করা, যাচাই করা ও বিশ্লেষণের কাজ শিক্ষার্থী নিজে করছেন না। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম আগের মতো করছেন না। এআইয়ের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর করলে চিন্তাশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা আছে।

তারা বলেন, একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে এআইকে ওই বিষয়ের ওপর ২০টি গবেষণাপত্রের তালিকা দিতে বললেন। এআই তাকে লেখক, জার্নাল, প্রকাশনা, প্রকাশনার বর্ষ, ডিওআইসহ তালিকা দিল। কিন্তু শিক্ষার্থী যদি একটি পেপারও না পড়েন, তাহলে তিনি আসলে গবেষণা করছেন না, শুধু এআইয়ের তৈরি তথ্যকে নিজের গবেষণা বলে উপস্থাপন করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো কখনো এমন গবেষণাপত্র, লেখক বা রেফারেন্স দিতে পারে যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। তথ্য যাচাই না করে গবেষণায় ব্যবহার করলে একদিকে যেমন অ্যাকাডেমিক সততার প্রশ্ন উঠবে, অন্যদিকে ভুল তথ্য ছড়াবে।

শিক্ষকরা বলছেন, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনে স্ল্যাইড ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করে থাকেন, কারণ এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে নম্বর কাটা হয় না। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা এমন সব উত্তর এআইকে হুবহু কপি করে লিখছেন যা প্রশ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তারা থিসিস পেপার ও রিসার্চ মনোগ্রাফেও এআই ব্যবহার করেন; যেহেতু এসবে এআই চেক করা হয় তাই তারা একটু সতর্ক থাকেন। এআই মুক্তশিক্ষার অবাধ ভা-ার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাইব্রেরির মান ভালো নয়, প্রয়োজনীয় বই পাওয়া যায় না, আবার অনলাইনে আলাদাভাবে রিসার্চ পেপার খুঁজে পাওয়া সময়সাধ্য, বিখ্যাত জার্নালে পাবলিক এক্সেস থাকে না। ফলে এআই শিক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। কেবল প্রয়োজন ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের পড়াশোনাকে সহজ করেছে। জটিল বিষয় বুঝতে, তথ্যের সারাংশ তৈরি করতে কিংবা লেখার কাঠামো ঠিক করতে এটা বেশ কার্যকরী। এআই তাদের শিক্ষার মান বাড়াতে সহযোগিতা করছে, এক ক্লিকে প্রাসঙ্গিক সব টপিক পেয়ে গেলে পড়াশোনায় বাড়তি সময় পাওয়া যায়। তারা এআইয়ে শতভাগ নির্ভর না করে মেধার বিকাশের চেষ্টা করছেন। যারা ফাঁকিবাজি করে নিজের কাজ এআইকে দিয়ে করানোর চেষ্টা করেন তাদের জন্য এটা ভয়াবহ সমস্যা।

২০২৫ সালে এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের গবেষকরা চ্যাটজিপিটি দিয়ে প্রবন্ধ লেখার সময় বুদ্ধিবৃত্তিক বা চিন্তনমূলক সম্পৃক্ততা পরীক্ষা করেন। ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয় একটি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে, একটি গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে এবং অন্যটি কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়াই লেখে। লেখার সময় ৩ দলের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের ব্রেইনের সংযোগ তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়। তাদের লেখায় একই ধরনের ধারণা ও কাঠামোর পুনরাবৃত্তি বেশি ছিল। গবেষকরা জানান, বারবার নিজের চিন্তাশক্তির বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তার অভ্যাস দুর্বল হওয়ার শঙ্কা বাড়ে।

বিদেশে একাধিক গবেষণাভিত্তিক বই প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখরের। তিনি দেশি-বিদেশি একাধিক নামি গবেষণার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘মানুষের বিকল্প এআই হতে পারে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে। ক্লাসরুমে এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের উচিত খোলামেলা আলাপ করা। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান জাগাতে হলে তাদের ভালো ও খারাপ দিকগুলো জানতে উৎসাহ দিতে ও তিরস্কার করতে হবে। এআই ছাড়া এখন শিক্ষার্থীরা চলতে পারবেন না। প্রয়োজন এআইয়ের সঠিক ব্যবহার জানা এবং বোঝা।’