প্রবাসীদের প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা কোথায়

যদিও সব সরকারই প্রবাসীদের ডলার পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে কিন্তু তারা নিজেরাই জানেন না যে, একটি বিরাট জনগোষ্ঠী বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে চান কিন্তু পাঠানো যায় না। বাংলাদেশে শুধু কোনো ব্যক্তি বিশেষের নামে অথবা রেজিস্টার্ড এনজিওদের নামে টাকা পাঠানো যায়। প্রবাস থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানেকে চ্যারিটি কাজের জন্যও টাকা পাঠাতে পারেন না। বিভিন্ন স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা থেকে শুরু করে গ্রামেগঞ্জে কিংবা শহরে যেকোনো সমাজ কল্যাণমূলক কাজে সহায়তার জন্য দেশে ডলার পাঠানো যাবে না। কিন্তু সরকার আর জনগণ আশা করে বাংলাদেশের বিপদে পড়া বিভিন্ন প্রকল্পে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পথঘাট সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজে কোন ব্যাংকের বা মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে আমরা যেন দেশে টাকা পাঠাই। তবে কেউ কেউ নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে শুধু তাদের আত্মীয়স্বজনের সহায়তা, ব্যবসা বাড়ানো, বাড়ি ঘর নির্মাণ করা বা মসজিদ-মন্দির, এতিমখানা বা জাকাতের টাকা গরিবের সহায়তার জন্য পাঠান।

আমরা জানি, গত কয়েক বছরে বিশ্বের সব জায়গা থেকে এমনকি মধ্যপ্রাচ্য থেকেও বেশি বিদেশি মুদ্রা আমেরিকা থেকে। কিন্তু এবার দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ডলারের সংকট প্রকট হয়। শোনা যায়, বাংলাদেশে পরাশক্তির নানা চাপ রয়েছে। আমেরিকার নতুন আরোপিত শুল্কের জন্য প্রধান বিদেশি মুদ্রা আয়ের গার্মেন্ট রপ্তানি হুমকির সম্মুখীন। তা ছাড়া ইউএসএইড বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন এনজিও দ্বারা অনেক উন্নয়নের কাজ এখন বন্ধ। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য বিদেশি সহায়তা দরকার। এত বছরের বিদেশি নির্ভরতা থেকে বিশেষ করে নতুন পরিস্থিতিতে মুক্তি পাওয়া কঠিন। তাই বাংলাদেশিরা যে যেখানে আছেন তাদের এগিয়ে আসতে হবে। রাতারাতি বিকল্প তৈরি হবে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যারা টাকা পাঠান তারা তাদের ঘামের আর কষ্ঠের অর্জন তাদের স্বজনদের পাঠাতে হয়। কিন্তু আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে যারা ভালো অবস্থায় আছেন তাদের একটি সুযোগ আছে। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনজিও রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়, অথচ এনএসআই এবং এনজিও ব্যুরোর রেজিস্ট্রেশন করা যে কত কঠিন তা শুধু ভুক্তভোগীরাই বোঝেন। এ ক্ষেত্রেও আমার অভিজ্ঞতা তিক্ত।

কভিডের সময় সিলেট কিডনি হাসপাতালের পক্ষ থেকে আমরা সিলেট সংলগ্ন উপজেলায় (খাদিমপাড়া আর সাউথ সুরমা) দুটি নতুন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি কভিড আইসোলেশন সেন্টার আর হাসপাতাল চালু করি এবং নিজ খরচে অক্সিজেন, ওষুধ, বিছানাপত্র, খাবার এবং ৪৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করি। অন্যান্য হাসপাতালে কোভিড রোগী নেওয়া শুরু করলে আমরা ৬ মাস পরে তা বন্ধ করি। নিউ ইয়র্ক থেকে আমার বন্ধু ফার্মাসিস্ট লিয়াকত ৫০ হাজার ডলার অনুদান দিতে চাইল, কিন্তু কিডনি ফাউডেশন এনজিওভুক্ত নয় বিধায় টাকা পাঠানো গেল না। আট বছর ধরে চ্যারিটি হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও, বহু চেষ্টার পরও এখনো এনজিওভুক্ত হয়নি। এখনো ফ্রি ডায়ালিসিস করার জন্য গরিব রোগীদের জন্য বিদেশ থেকে হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো যায় না। আমার বন্ধু শিহাব বলল তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি বিভাগের উন্নতির জন্য কোনো অনুদান পাঠাতে পারে না। সরকারের বড় দায়িত্ব হবে, রেমিট্যান্স পাঠাতে যত প্রকার বাধা রয়েছে সেসব দূর করা। এনজিও ব্যুরো, এনএসআইসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের সব অনর্থক বাধা সরাতে হবে। হয়রানি বন্ধ করে পথ মসৃণ করতে হবে। এনজিও বা জাতীয় সংস্থা ছাড়াও নিজের অঞ্চলের উন্নতির জন্য, নিজের স্কুলে বা স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও যেন বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যায় তা নিশ্চিত করা। প্রবাসে আমরা বলেছিলাম সবাই যদি কমপক্ষে বছরে ২০০ ডলার পাঠাই তাহলে দেশের সংকটগ্রস্ত বহু সংস্থা এবং মানুষ উঠে দাঁড়াতে পারবে। অনেকেই সাড়া দিয়ে ফোন করেছেন কিন্তু এনজিও ছাড়া পাঠানো যাবে না, তাই এই প্রেক্ষাপটে করণীয় কি তা পরিষ্কার করা দরকার। ব্যবস্থা ভালো করতে পারলে অনেক কিছুরই উন্নতি করা সম্ভব। ব্যবস্থায় গলদ রেখে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর আহ্বান জানানো মানে তো নিষ্ফল আহ্বান। আগে দরকার বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার নিরসন। জটিলতার নিরসন না ভালো কিছুর প্রত্যাশা অমূলক। উল্লিখিত সমস্যাগুলোর ব্যাপারে অনেকেই অবগত থাকলেও এর নিরসনে মনোযোগ গভীর নয়। এমনটি প্রত্যাশিত নয়, হতে পারে না।

গত চার বছর ধরে মূল ধারার গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে আমরা বাংলাদেশ ইউএস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস বড় করে ট্রেড ফেয়ার আর রেমিট্যান্স ফেয়ারের আয়োজন করে আসছি। এই যৌথ উদ্যোগের বেশ কিছু অর্জন আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা তাদের আস্থা অর্জন করে একটি সম্মানিত পার্টনার হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সব সম্পর্ক উন্নতির জন্য এই প্রচেষ্টা একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশি আমেরিকানদের উৎসাহিত করার জন্য আমরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। পেশাগত বিশেষজ্ঞ নিয়ে আমরা প্রথম দুই বছর অনুষ্ঠানের আগে জুমে মিটিং করেছি। আইটি, ফার্মাসিউটিক্যাল, চিকিৎসক, শিক্ষক, রিসার্চার নিয়ে নিজ ক্ষেত্রে দেশের উন্নতি করার জন্য তাদের মতামত নিয়েছি। প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পাঠিয়েছি। বিশেষ করে আইটিতে প্রচুর সহায়তার আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু সরকারের তরফে কোনো উৎসাহ না দেখানোয় অনেকেই নিরাশ হয়েছেন। কিন্তু কেউ কেউ হয়তো নিজ চেষ্টায় যুক্তও হয়েছেন। গত বছর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের স্মল বিজনেসের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান ক্যাথি লোফলার। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে আমেরিকাতে এখন দেশি-বিদেশে কোম্পানিগুলোর কী কী নতুন সুযোগ রয়েছে। তখন প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য, ইতালি, পোল্যান্ড, কানাডার বাংলাদেশি এনআরবি বিজনেস চেম্বারের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। এবার আমেরিকার বিভিন্ন এথনিক চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দও অংশগ্রহণ করেন। তার মধ্যে কোরিয়ান, দক্ষিণ আমেরিকা, ইলাতিয়ান, নেপালিস আমেরিকানরা চেম্বার্স অব কমার্স এ জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। দক্ষিণ আমেরিকার চেম্বার বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য সব সুযোগ- সুবিধা দেওয়ার জন্য আহ্বান করে। অনেক ফ্যাশন গ্রুপের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার গ্লোরিয়া স্টার কিন বাংলাদেশের ফ্যাশনকে প্রোমট করার জন্য ডিজাইনারদের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং অর্থ উপদেষ্টার প্রতি অনুরোধ, আপনাদের দায়িত্ব হবে প্রথমেই প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর জন্য ব্যক্তি বা শুধু এনজিওভুক্ত সংঘটন ছাড়াও যারা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণলায়ের নথিভুক্ত যেমন অন্যান্য সামাজিক সংগঠন, স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, পরিবেশ আন্দোলন ও বিভিন্ন চ্যারিটি সংগঠনকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাবার অনুমোদন প্রদান করুন। তাদের কাছে দায়িত্ব দিয়ে আইনিভাবে স্বচ্ছতা রাখার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করুন। বাংলাদেশের মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত বা সরকারি সংস্থা প্রবাসীদের বিভিন্ন কার্যক্রমকে তেমন গুরুত্ব দেওয়ার কথা কোনো দিন ভাবেন না। কিন্তু বিশ্বের উন্নত দেশে তারা দ্বৈত নাগরিক হওয়ায় তাদের সেই দেশে গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। যেমন কোভিডের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে এসে বললেন আমেরিকা আমাদের কোনো ভ্যাকসিন দেবে না। অথচ তার এই মন্তব্যের ৭ দিনের মাথায় আমেরিকা বাংলাদেশকে ৫ মিলিয়ন ভ্যাকসিন দিল। সেটি হয়েছিল প্রবাসী বাংলাদেশি আমেরিকানদের সহিযোগিতায়। ডা. মাসুদের সঙ্গে আলাপ করে আমি নেভাদার কার্ডিওলজিস্ট ডা. চৌধুরী হাফিজ আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হারিসের বন্ধু হাফিজের রোগী নেভাদার সিনেটর। কমলা হারিস হোয়াইট হাউজের কভিড টিমের সদস্য হিসেবে হাফিজকে একজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেন। সেই জুমের মিটিংয়ে আমার সঙ্গে রোজ পরামর্শ করে হাফিজ বোঝাতে সক্ষম হলো, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো বেশ ভঙ্গুর, কভিড বড় আকারে শুরু হলে মৃত্যুর হার হবে আকাশচুম্বী। টিমের সদস্যরা মৃদু হেসে তা মেনে নিল। তখন আমেরিকা যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভারতকেও ভ্যাকসিন দেয়নি। বাংলাদেশের সরকার আর মানুষ যখন ভ্যাকসিন না পাওয়ার ভয়ে দিশেহারা তখন আমেরিকান হিসেবে সম্মানিত প্রবাসীদের অনুরোধে কাজ হলো। অনেক প্রবাসী আছেন যারা মেধা আর অভিজ্ঞতায় আমেরিকাতে সম্মানিত। বাংলাদেশ রাজনীতি আর স্বজনপ্রীতির ঊর্র্ধ্বে থেকে তাদের সম্মানের সঙ্গে যুক্ত করলে সবাই উপকৃত হবেন। প্রবাসীদের যেকোনো উদ্যোগকে সম্মান দেখানো, আর দেশের ব্যাংক এবং সংস্থাগুলোকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া এবং দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। দায়বদ্ধতা আর জবাবদিহির ঘাটতি রেখে শুভ কিছু নিশ্চিত করা কঠিন। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিট দায়িত্বশীলরা উল্লিখিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে মনোযোগী হবেন এবং সমস্যার নিরসনে ত্বরিত পদক্ষেপ নেবেন।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি, কলেজ অব মেডিসিন ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্র সভাপতি, বাংলাদেশ-ইউএসএ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।