ভোলার গ্যাস দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে উল্লেখ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমদ সোহেল মঞ্জুর বলেছেন, ভোলার কাছে পুরো বাংলাদেশ ঋণী। একই সঙ্গে ভোলা-১ আসনে বিএনপির জোটের স্বার্থে ‘স্যাক্রিফাইস’ করার বিষয়টি তুলে ধরে বিজেপির নেতা ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভোলা জেলা পরিষদ হলরুমে জেলা বিএনপি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর।
সভায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি এবং যুবদল, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, কৃষক দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
বক্তব্যের শুরুতে বিএনপির জন্য দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীদের স্মরণ করেন সোহেল মঞ্জুর। তিনি স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত দলের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বিশেষভাবে জাতীয়তাবাদী দলের অন্যতম নেতা মোশারেফ হোসেন শাহজাহান কাকাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ভোলার অনেক কিছুই সম্ভব হয়েছে এসব নেতাকর্মীর ত্যাগের কারণে।
ভোলার কৃতী সন্তান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন তিনি।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সোহেল মঞ্জুর বলেন, তিনি যেভাবে ভালোবাসা ও সম্মান দিয়েছেন, তাতে তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছেন। ভোলার দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পারবেন তা জানেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারলে ভোলাকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি একটি বড় পরিবার। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব থাকতেই পারে, তবে সেই দূরত্ব কাটিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পদ-পদবি পাওয়া বা না-পাওয়ার চেয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভোলা-১ আসন প্রসঙ্গে সোহেল মঞ্জুর বলেন, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বিজেপির নেতা হলেও বিএনপির জোটের কারণে তিনি এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এই আসনে বিএনপি জোটের স্বার্থে ‘স্যাক্রিফাইস’ করেছে। তাই বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়েই পার্থকে কাজ করতে হবে।
পার্থের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনায় বসার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করা যায়, সে বিষয়ে তিনি কথা বলবেন। তিনি আশা করেন, পার্থও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন।
ভোলার উন্নয়ন প্রসঙ্গে সোহেল মঞ্জুর বলেন, জেলায় উন্নয়নের অনেক সুযোগ রয়েছে। আগামী চার বছরে দৃশ্যমান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। জনস্বার্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভোলার গ্যাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাসে দেশের অন্যান্য এলাকার কলকারখানা চলছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অথচ গ্যাস উৎপাদনকারী এলাকার মানুষকে মাঝে মাঝে লোডশেডিংয়ের কষ্ট পেতে হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে গ্যাসভিত্তিক শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। এলএনজি ও সিএনজি-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে ভোলায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জেলার ছেলে-মেয়েদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারত্ব কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ভোলার উন্নয়ন পরিকল্পনায় জেলার সব সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের একসঙ্গে বসার আহ্বান জানান সোহেল মঞ্জুর। জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি ও চোরাচালান করা যাবে না। যারা কাজ পাবেন, তারাও দুর্নীতি করতে পারবেন না। কোনো এমপি, মন্ত্রী বা তাদের আত্মীয়স্বজন অন্যায় করলেও বিচার করতে হবে এবং কেউ বিচারের বাইরে নয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণে দলীয় নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় মাদক কেনাবেচার হটস্পট রয়েছে, সেখানে নজরদারি বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। মাদক প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও ওয়ার্ডে গিয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসার পরামর্শ দেন সোহেল মঞ্জুর। তাদের কথা শোনা, পরামর্শ নেওয়া এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জনগণের কাছে গিয়ে সরকারের উন্নয়ন ও দলের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিএনপির ঘোষিত কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণকে জানানোর কথা বলেন। একই সঙ্গে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দলের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপি মাদকের বিরুদ্ধে এবং মাদক প্রতিরোধ করতে চায়। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসও দল চায় না। জনগণের কাছে গিয়ে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের কথাও তুলে ধরতে হবে বলে জানান তিনি।
সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোহেল মঞ্জুর বলেন, দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে এবং সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে। মন্ত্রণালয়ের কাজেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের স্থানীয় কমিটিগুলোর তালিকা তৈরি করে তাঁর কাছে পাঠানোর আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। এর মাধ্যমে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করার কথা বলেন তিনি।
নিজের দায়িত্বকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে সোহেল মঞ্জুর বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমিনুল ইসলাম নয়ন, হাফিজ ইব্রাহিম, পার্থ ও গোলাম নবী আলমগীরসহ ভোলার নেতৃত্বে থাকা সবাইকে একসঙ্গে বসে জেলার উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ভোলা-১ আসনে বিএনপির ‘স্যাক্রিফাইস’-এর বিষয়টি আবারও তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গোলাম নবী আলমগীর নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে জোটের স্বার্থে স্যাক্রিফাইস করেছেন। তাঁর আশা, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এই ত্যাগের মূল্যায়ন করবেন এবং বিএনপির নেতাকর্মী ও গোলাম নবী আলমগীরের ত্যাগ ভুলে যাওয়া হবে না।
সোহেল মঞ্জুরের ভাষ্য, ভোলা-১ আসন মূলত বিএনপির আসন। যেহেতু বিএনপি জোটের স্বার্থে সেখানে ছাড় দিয়েছে, তাই বিএনপিকে সঙ্গে নিয়েই এই আসনে কাজ করতে হবে।
সভায় জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।