সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে নাটোরের গুরুদাসপুরে সার পাচারের অভিযোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ভিডিওতে একটি শ্যালোচালিত ভটভটিতে সারবোঝাই বস্তা নিয়ে তাড়াশের দিকে যেতে দেখা যায়। এ ঘটনায় ডিলার গিয়াস উদ্দিন প্রামাণিকের বিরুদ্ধে পাশের তাড়াশ উপজেলায় সার পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। তবে ডিলারের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে সার পাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে তদন্ত শুরু করেছে গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি বিভাগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ভটভটিতে সারবোঝাই বস্তা দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের কথোপকথনে ৪০ বস্তা সার এবং সেগুলো তাড়াশের সবুজপাড়া এলাকায় নেওয়ার কথা শোনা যায়। ভটভটি চালকের বক্তব্যেও ডিলার গিয়াস উদ্দিনের নাম উঠে আসে।
তবে এ নিয়েই সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন। ভিডিওতে ৪০ বস্তা সারের কথা শোনা গেলেও ডিলার বলছেন, ভটভটিতে ছিল মাত্র ১৬ বস্তা সার।
গিয়াস উদ্দিন প্রামাণিকের দাবি, ভিডিওটি ১৫ সেপ্টেম্বরের নয়, ১১ সেপ্টেম্বরের। তাঁর ভাষ্য, গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের রানীগ্রামের কৃষক শহিদুল ও রাশিদুল তাঁর কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে আট বস্তা করে মোট ১৬ বস্তা সার কিনেছিলেন। ওই সারই ভটভটিতে করে নেওয়া হচ্ছিল।
গিয়াস উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, পথে রাঙ্গা মোল্লা নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি ভটভটি আটকে প্রথমে ২০ হাজার এবং পরে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় ঘটনাটিকে সার পাচার হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
তবে রাঙ্গা মোল্লা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, গুরুদাসপুরের ডিলারের সার পাশের তাড়াশ উপজেলায় নেওয়া হচ্ছিল এবং তিনি সেটি ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে, স্থানীয়দের কেউ কেউ রাঙ্গা মোল্লার বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের প্রকৃতি, কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা রয়েছে কি না এবং সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান ঘটনাকে মিলিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সারগুলো কার নামে বিক্রি হয়েছিল, ডিলারের বিক্রয় রেজিস্টারে কত বস্তার হিসাব রয়েছে, ওই দিন ডিলারের কত সার মজুত ছিল, ভটভটির প্রকৃত গন্তব্য কোথায় ছিল এবং ভিডিওতে ৪০ বস্তা সারের কথা কেন শোনা গেল—তদন্তে এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়ার কথা।
একই সঙ্গে ডিলারের করা চাঁদাবাজির অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে। কারণ, এক পক্ষ সার পাচারের অভিযোগ করছে, অন্য পক্ষ অর্থ দাবি করার অভিযোগ তুলছে। নথি, সাক্ষ্য ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই ছাড়া দুটি অভিযোগের কোনোটির বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম রাফিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ হাতে না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে সারসংক্রান্ত অনিয়ম ঠেকাতে উপজেলায় সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। বর্তমানে উপজেলায় সারের কোনো ঘাটতিও নেই।
সব মিলিয়ে, কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার কোথায় যাচ্ছিল—তার উত্তর এখনই মিলছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বাইরে গিয়ে বিক্রয় রেজিস্টার, মজুতের হিসাব, পরিবহনের গন্তব্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করলেই পরিষ্কার হতে পারে, এটি সত্যিই সার পাচারের ঘটনা, নাকি অন্য কোনো বিরোধ থেকে তৈরি হওয়া অভিযোগ।