শিশু অপরাধ

সমন্বিত সামাজিক সক্রিয়তা দরকার

প্রতিটি শিশু পরিবারের যত্নে সমাজে বেড়ে ওঠার কথা, যেখানে ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে সে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। এটা তার নাগরিক অধিকার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বহু শিশু এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর্থিক সামর্থ্য কম-বেশি আছে এমন পরিবারের শিশুরা পড়াশোনার সুযোগ কিছুটা পেলেও দরিদ্র পরিবারে একই বয়সের শিশুর অনেকে তা থেকে বঞ্চিত। এর বাইরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রায় সব শিশুরই বেশ সীমিত। একসময় পরিবারের ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি তত্ত্বাবধানের বাইরেও শিশুরা সামাজিক নজরদারিতে থাকত। কিন্তু এখন তা নেই বললেই চলে। পরিবার ভাঙছে। মানুষ সমাজ-বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা, যাদের অনেকে ধীরে ধীরে অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

দেশ রূপান্তরে গতকাল শুক্রবার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ‘অপরাধে এবার শিশু গ্যাং’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু শিশু বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে গেছে। সুযোগ পেলে একা কিংবা দুই-তিনজন মিলে চুরি করছে। কয়েকজন মিলে একসঙ্গে ‘গ্যাং’ হয়ে বড়দের মতো অপরাধও করছে। ছুরি দেখিয়ে মোবাইল ফোন, টাকা, ঘড়ি, ব্যাগ যা পাচ্ছে ছিনতাই করছে। বড়দের অপরাধের সময় আক্রান্ত পথচারীর চিৎকারে যেমন কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায় না, শিশুদের অপরাধের সময় একইভাবে দেখে-শুনেও এড়িয়ে চলে প্রায় সবাই। এর পরিণামে অপরাধে জড়িত শিশুরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের অনেকে মাদকাসক্ত। পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদকচক্রের সহায়তাকারী হিসেবে কিশোর গ্যাংয়ের মতো দলবদ্ধ শিশুরাও ব্যবহৃত হচ্ছে।

শিশুরা অপরাধ দলবদ্ধভাবে করুক, কিংবা একা; তাদের অধিকাংশই ভাসমান এবং অভিভাবকহীন। ঢাকার ১১০টিসহ সারা দেশে প্রায় ৪৫ হাজার বস্তি আছে। অপরাধে জড়িত বেশিরভাগ শিশু থাকে এসব বস্তিতে। ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনসহ ঘনবসতিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকে অনেকে। পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় ১১৮টি কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি শিশু গ্যাংও সক্রিয় রয়েছে।

পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ বন্ধু ও সহপাঠীদের দ্বারা শিশুরা দ্রুত নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। অ্যাডভেঞ্চারে জড়িত হওয়ার আগ্রহ শিশুর অপরাধ করার অন্যতম কারণ। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু জীবিকার জন্য, অনলাইন জুয়া ও প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্যাং সংস্কৃতির ধারণা থেকেও অনেকে অপরাধে জড়ায়। বড়দের অপরাধী চক্রগুলো অরক্ষিত, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুরা এদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। শিশু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শিশু আইন, ২০১৩ আছে, যা পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি যেকোনো ব্যক্তি ‘শিশু’ হিসেবে গণ্য হয়। তবে আমরা মনে করি, শুধু আইন করে বা সাজা দিয়ে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আবার, শিশু আইনের মূল লক্ষ্য শাস্তি দেওয়াও নয়; বরং শিশুর সংশোধন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।

আমরা এটাও মনে করি, শিশু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি পদক্ষেপ হতে পারে যারা শিশুদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িত করে, সেই সব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শিশুদের চুরি ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে পাওয়া জিনিসপত্র যারা কেনাবেচা করে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা দরকার। একই সঙ্গে, শিশু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবার আগে দরকার পরিবার ও স্বজনদের সক্রিয়তা এবং সামাজিক নজরদারি। শিশুর শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করাও দরকার। সবচেয়ে ভালো হয়, পরিবারের তত্ত্বাবধানে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া গেলে। বাবা-মা, অভিভাবক এবং বর্ধিত পরিবারের সদস্যদেরও শিশুকে তত্ত্বাবধান ও নজরদারির জন্য প্রশাসন ও আদালত থেকে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। সেটা সম্ভব না হলে সমাজকর্মী বা প্রবেশন কর্মকর্তাদের তদারকিতে শিশুদের মানসম্মত সংশোধন কেন্দ্রে রাখা যেতে পারে। পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে শিশুদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সব মিলিয়ে শিশু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দরকার সমন্বিত সামাজিক সক্রিয়তা এবং তা অবিলম্বে।