এশিয়ান গেমসে প্রথমবার টেকেবল; যে খেলায় জড়িয়ে ফুটবল কিংবদন্তী

ফুটবল এবং টেবিল টেনিসের এক অদ্ভুত অথচ রোমাঞ্চকর সংমিশ্রণ হলো টেকেবল। বিশেষ এক ধরনের বাঁকানো টেবিলের ওপর ফুটবলকে পা, মাথা কিংবা শরীরের অন্য অংশ দিয়ে (হাত বা কনুই বাদে) ভল করে জালের ওপারে পাঠাতে হয়। ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাঙ্গেরির ফুটবলের সোনালী যুগে খেলোয়াড়দের ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে ফুট-টেনিস খেলার ধারণা থেকে এর উৎপত্তি। প্রায় এক দশক আগে হাঙ্গেরির দুই বন্ধু—একজন সাবেক ফুটবলার ও একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী—পিংপং টেবিলে ফুটবল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আধুনিক টেকেবলের রূপ দেন। পরে ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক টেকেবল ফেডারেশন  গঠিত হয়।
 
স্প্যানিশ ফুটবলের কিংবদন্তি কার্লেস পুয়োলের সমর্থন এবং এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার হাত ধরে আন্তর্জাতিক টেকেবল ফেডারেশন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। জাপানের নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো পদক ইভেন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে টেকেবল তার অলিম্পিক যাত্রার দিকে আরও এক ধাপ দৃঢ় পদক্ষেপ ফেলল।

নাগোয়ার হিগাশি স্পোর্টস সেন্টারে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ৫টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ৩টিই নিজেদের করে নিয়েছে থাইল্যান্ডের অ্যাথলেটরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় খেলা ‘সেপাক তাকরাও’-এর সঙ্গে টেকেবলের বেশ মিল থাকায় এশীয় দেশগুলোতে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

রোমাঞ্চকর ফাইনালে মিয়ানমারের ইতিহাস

এশিয়ান গেমসের টেকেবলের ইতিহাসে প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন মিয়ানমারের ওয়াই খিন হিন। রোমাঞ্চকর ফাইনালে তিনি ইন্দোনেশিয়ার সুমায়াকে ২-১ সেটে পরাজিত করেন (১০-১২, ১২-৮, ১২-৯)। ম্যাচ শেষে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, "আমি আনন্দিত এবং আমার কোচের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার পরবর্তী লক্ষ্য ২০২৭ সালের এসি গেমসে মিয়ানমারের জন্য আরেকটি স্বর্ণপদক জেতা।"

অন্যদিকে, পুরুষদের একক বিভাগে ইরাকি প্রতিপক্ষকে হারিয়ে সোনা জয়ের পর দক্ষিণ কোরিয়ার লি জুন-সুক বলেন, "আমি এতটাই খুশি যে এই মুহূর্তে মারা গেলেও আমার আফসোস থাকত না। আমি পদক জিততে চেয়েছিলাম, তবে এমন কিছু কল্পনাও করিনি।"

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের বৈচিত্র্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফিলিপাইন দলের হয়ে খেলেছেন ১৪ বছর বয়সি তিন কিশোর। জাপানের প্রতিনিধিত্বকারী তাকাহিরো নাদিমা পেশায় একজন কৌতুক অভিনেতা, যিনি ৪০ বছর বয়সে এসে এই বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ৪৪ বছর বয়সি হুসনি উবা এর আগে চারবার সেপাক তাকরাওতে অংশ নেওয়ার পর এবার টেকেবলে নতুন করে মাঠে নামলেন।

অলিম্পিকের মঞ্চে যাওয়ার স্বপ্ন

টেকেবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লাসলো ভাজদা আত্মবিশ্বাসী যে, এশিয়ান গেমসে এই দুর্দান্ত অভিষেক আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিকে আকৃষ্ট করবে। তিনি বলেন, "এটি আমাদের যাত্রার একটি দুর্দান্ত মাইলফলক। বিশ্বজুড়ে টেকেবল কমিউনিটি একদিন অলিম্পিক খেলার স্বপ্ন দেখে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এর আবেদন ও গ্রহণযোগ্যতা অলিম্পিকের দুয়ার খুলে দেবে।"
প্রথমবার আয়োজিত টেকেবলের প্রতিযোগীদের পদক তুলে দেন স্পেনের কিংবদন্তী কার্লোস পুয়োল

খেলাটির প্রচার ও প্রসারে সাবেক বার্সেলোনা অধিনায়ক কার্লেস পুয়োল বড় ভূমিকা রাখছেন। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ক্লিনিক পরিচালনা করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য প্রচার চালান। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, পিএসজি এবং বার্সেলোনার মতো বিশ্বখ্যাত ক্লাবগুলোও তাদের ট্রেনিংয়ে টেকেবল টেবিল ব্যবহার করে থাকে। পুয়োল বলেন, "পেশাদার খেলোয়াড়দের টেকনিক ও ওয়ার্ম-আপের জন্য এটি দারুণ। একটি মজার খেলা হিসেবে এর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল।"