আবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি

বিরূপ প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেল জনজীবনের এই তিন জরুরি অনুষঙ্গ এখন বড় উপসর্গ হয়ে উঠেছে। নানা দিক থেকে জীবনযাত্রার ওপর চড়া চাপে সাধারণ মানুষ পিষ্ট, তখন দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা ও পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা দরে বিক্রির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে এ দাম কার্যকর হবে। বিভিন্ন মহল থেকে এই মূল্যবৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলা হয়েছে এবং আমরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি না। উল্লেখ্য, সবশেষ জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও সেই দাম বহাল ছিল। কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো এ প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে একই দিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কারও সঙ্গে আলোচনা না করে জ্বালানি তেলের মূল্য ১৫ শতাংশেরও বেশি বাড়ানোয় নানা মহলে ক্ষোভেরও সঞ্চার হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, যখনই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এর তাৎক্ষণিক বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাজারে, গণপরিবহনের ভাড়াসহ জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষঙ্গে। আমরা জানি, দেশে মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে এমনিতেই মানুষ নাকাল। মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয়  নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। শিল্প কারখানায় উৎপাদনব্যবস্থায় অভিঘাত লেগেছে গ্যাস-বিদ্যুতের স্বল্পতায়। আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে কারও সঙ্গে আলোচনা না করে জ্বালানি তেলের মূল্য ১৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করায় সব খাতে আরও  বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ জনগণকে এর মাশুল গুনতে হবে। কর্মক্ষেত্রেও এর বিরূপ প্রভাব ঠেকানো কঠিন হবে। সংকুচিত হবে ব্যবসা-বাণিজ্য। সরকার যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলছে, সে ক্ষেত্রে লক্ষ্য বাস্তবায়ন দুরূহ হয়ে পড়বে।

খরচের হিসাব কষতে কষতে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠেছে তখন এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধির বিষয়টি কোনোভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। আমরা সংগত কারণেই বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানাই। বর্তমান সরকার ৫ মাসে ৩ বার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল, যা সরকারের জনবান্ধব নীতি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কতটা বেড়েছে, তার সঙ্গে দেশের বাজারে কতটা বাড়ানো যৌক্তিক, তা কি জনগণ জানার অধিকার রাখে না? বিপিসির লোকসানের দায় জনগণ নেবে কেন? বিপিসির দক্ষতা-ব্যবস্থাপনা কিংবা ক্রয় প্রক্রিয়াসহ অন্যান্য পদ্ধতির ব্যাপারে জনস্বার্থমূলক চিন্তা তো তাদেরই করতে হবে।

সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বিষয়টি তো সরকারকেই আমলে রাখতে হবে। নানা চাপে পিষ্ট জনজীবনে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি আরও চাপ বাড়াল এবং তা সমাজে অস্বস্তিও ঊর্ধ্বমুখী করবে। আমরা আশা রাখতে চাই, সরকার সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা করুক। বর্ধিত দাম প্রত্যাহার করে দ্রুত জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনুক। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, এই সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে আমরা একমত নই। পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি সচল রাখা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য যথাযথ নজরদারি-তদারকি ও পরিকল্পিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা না করে জনগণের ওপর চাপ বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় আমরা কোনোভাবেই সায় দিই না। জ্বালানির জ্বালায় মানুষ যেন আর না ভোগে। আমরা চাই সরকার এটা নিয়ে নতুন করে ভাববে।