সন্তানের বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের দায়িত্ব

সন্তান পরিবারের অমূল্য সম্পদ। তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব। সন্তান কী শিখছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং কার সঙ্গে মিশছে, এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা জরুরি। কারণ, বন্ধুত্ব মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ভালো বন্ধু সন্তানকে সৎ ও আদর্শবান হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, অসৎ সঙ্গ তাকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। তাই সন্তানের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে মা-বাবাকে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হবে। ইসলামও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। 

বন্ধুত্বের প্রভাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতা হয়তো তোমাকে আতর উপহার দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে আতর কিনবে, কিংবা তার কাছ থেকে সুগন্ধ পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।’ (সহিহ বুখারি)

সন্তানের বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের দায়িত্ব। ছবি: সংগৃহীত

এই হাদিসে বন্ধুত্বের প্রভাব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সৎ মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করলে ভালো গুণ অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। অসৎ সঙ্গের কারণে মানুষের চরিত্র ও আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তাই সন্তান যেন ভালো মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের যত্নবান হতে হবে।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে অসৎ বন্ধুত্বের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল।’ (সুরা ফুরকান ২৮-২৯) 

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, অসৎ বন্ধুত্ব মানুষের জন্য অনুশোচনার কারণ হতে পারে। তাই সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ভালো বন্ধু বেছে নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।

সন্তানের বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব হলো, তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। সন্তান যেন নির্ভয়ে নিজের কথা মা-বাবাকে বলতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে হবে। তবে অকারণে সন্দেহ করা বা কঠোর আচরণ করা উচিত নয়। এতে সন্তান অভিভাবকের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। বরং ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সন্তানকে ভালো মানুষের সঙ্গে মেশার গুরুত্ব বোঝাতে হবে। যে বন্ধু নামাজ পড়ে, সত্য কথা বলে, বড়দের সম্মান করে এবং অন্যের উপকার করে, তার কাছ থেকে ভালো কিছু শেখার সুযোগ থাকে। সন্তানকে এমন বন্ধু বেছে নিতে উৎসাহিত করতে হবে, যারা তাকে পড়াশোনা, ইবাদত ও ভালো কাজে সহযোগিতা করবে। শুধু ধনসম্পদ, পোশাক কিংবা বাহ্যিক পরিচয় দেখে বন্ধুর যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত নয়। বরং তার চরিত্র ও আচরণকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

তৃতীয়ত, সন্তানের সময় কাটানোর বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে এবং অবসর কীভাবে কাটায়, এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোর বয়সে সন্তান নানা ধরনের প্রভাবের মধ্যে পড়ে। এ সময় তাকে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। তবে তার ব্যক্তিগত পরিসর ও বয়সের উপযোগী স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

চতুর্থত, অভিভাবককে নিজের আচরণের মাধ্যমে সন্তানের সামনে আদর্শ স্থাপন করতে হবে। মা-বাবা যদি সৎ, ভদ্র ও দায়িত্বশীল মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করেন, সন্তানও তা থেকে শিক্ষা পাবে। কারণ, শিশুরা অনেক সময় কথার চেয়ে কাজ দেখে বেশি শেখে। তাই সন্তানকে ভালো বন্ধু নির্বাচনের শিক্ষা দেওয়ার আগে নিজের জীবনেও সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। 

সন্তানের বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রয়োজনে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এতে সন্তানের বন্ধুত্ব সম্পর্কে স্বাভাবিক ধারণা পাওয়া যাবে। কোনো বন্ধুর আচরণে সমস্যা দেখা দিলে সন্তানকে অপমান না করে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে হবে।

সন্তানের বন্ধু নির্বাচন তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ দায়িত্ব অবহেলা করা উচিত নয়। ভালোবাসা, সচেতনতা, সুন্দর শিক্ষা ও উত্তম আদর্শের মাধ্যমে অভিভাবক সন্তানকে সৎ সঙ্গ বেছে নিতে সাহায্য করতে পারেন। এতে তার চরিত্র গঠন সহজ হবে এবং সে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণের পথে চলার অনুপ্রেরণা পাবে।