শর্তযুক্ত হেবা ইসলামসম্মত নয়

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত বা আংশিক বঞ্চনা রোধে ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে হেবা’ প্রস্তাবকে শরিয়তবিরোধী, বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য বলেছেন জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে খতিবের প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহ শরিয়তের দলিল ও ফিকহের আলোকে এ মত দেয়। 

সেখানে বলা হয়, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি কন্যাকে হেবা করলেও ওই সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, ভোগদখল ও আয় নিজের জন্য সংরক্ষণ করবেন এবং তার মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি কন্যার কাছে চলে যাবে, এ ধরনের শর্তযুক্ত হেবা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু সম্পত্তির অধিকার রয়েছে, তা কোরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে নির্ধারিত। ফলে সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো যুক্তির ভিত্তিতে মহান আল্লাহর নির্ধারিত মিরাসের বিধানে পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ নেই বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও বলা হয়, বাহ্যিকভাবে কোনো ব্যবস্থাকে ‘হেবা’ বা দান বলা হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে। প্রকৃত হেবা সম্পন্ন হলে সম্পত্তি দাতার মালিকানা থেকে বের হয়ে গ্রহীতার মালিকানায় চলে যায়। দাতা নিজের জন্য ওই সম্পত্তির আজীবন ভোগদখল বা জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে রাখলে তা হেবার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়।

ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানের নির্ধারিত অংশকে পাশ কাটানোর উদ্দেশ্যে কোনো কৌশল অবলম্বন করা শরিয়তসম্মত নয়। বিশেষ করে উত্তরাধিকারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার মাধ্যমে মৃত্যুর পর কার্যত সম্পত্তির বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্তযুক্ত কোনো ব্যবস্থাকে ‘হেবা’ বলা হলেও তা হেবার প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ হেবার ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা ও দখল গ্রহীতার কাছে দাতার জীবদ্দশাতেই হস্তান্তরিত হওয়া প্রয়োজন। মৃত্যুর পর কার্যকর করার জন্য সম্পত্তি রেখে গেলে তা হেবার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়।

সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দাতার মৃত্যুর পর সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ যদি স্বেচ্ছায় ও সম্মতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে রাজি হন, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। কারণ, তখন তা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের বিষয় থাকে না, ওয়ারিশদের নিজস্ব সম্মতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

কন্যার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শরিয়তসম্মত পথ রয়েছে বলেও সেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে।

কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি থেকে কন্যাকে হেবা বা দান করতে পারেন। তবে হেবা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির মালিকানা ও দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। দাতা নিজের জন্য ওই সম্পত্তির আজীবন ভোগদখল বা জীবনস্বত্ব সংরক্ষণের শর্ত আরোপ করলে তা শরিয়তসম্মত হেবা হিসেবে গণ্য হবে না।

সেখানে দখল হস্তান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। হেবা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার জন্য গ্রহীতার কাছে সম্পত্তি প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তর এবং ভোগদখলের অধিকার অর্পণ করা জরুরি। হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে দাতা মারা গেলে ওই হেবা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং সম্পত্তিটি দাতার উত্তরাধিকার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হবে।

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি থেকে কন্যাকে হেবা করতে পারেন। তবে মৃত্যুর পর কে ওই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন, তা নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে হেবাকে ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত নয়।

পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অনেক পরিবারের উদ্বেগ থাকতে পারে। বিশেষ করে দূরবর্তী আত্মীয়দের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

তবে এসব সামাজিক বাস্তবতা ইসলামি উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের কারণ হতে পারে না বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় শরিয়তসম্মত হেবা, বৈধভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর এবং অন্যান্য অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার কথা বলা হয়েছে। (তিরমিজি ২১১৭, কিফায়াতুল মুগতাজি ১১/৪১০, মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া, ঢাকা)

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত