ফরায়েজি আন্দোলনের আপসহীন নেতা

উনিশ শতকে বাংলায় ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয় ফরায়েজি আন্দোলন। মুসলমানদের ফরজ ইবাদত ও ধর্মীয় বিধান পালনে সচেতন করতে এবং জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিহত করতে ফরায়েজি আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ আন্দোলনের আপসহীন নেতা ছিলেন মুহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া।

তিনি ১৮১৯ সালে বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ইসলামি সংস্কারক ও ফরায়েজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র। পিতার কাছ থেকেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।

মাত্র ১২ বছর বয়সে জ্ঞানার্জনের জন্য তাকে মক্কায় পাঠানো হয়। সেখানে তিনি প্রায় পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন। পিতার অসুস্থতার কারণে ১৮৩৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। তখন বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল বেশ জটিল। জমিদার, নীলকর ও ফরায়েজি আন্দোলনের বিরোধীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলছিল।

১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করেন। তার নেতৃত্বে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের নিপীড়িত কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন।

তখন জমিদার ও নীলকররা কৃষকদের ওপর নানা ধরনের কর ও খাজনা চাপিয়ে দিত। দুদু মিয়া এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেন। তিনি জমিদার ও নীলকরদের ভাড়াটে বাহিনীর মোকাবিলায় একটি লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। তার অনুসারীরা এসব বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। ফলে ফরায়েজি আন্দোলন অধ্যুষিত এলাকায় দীর্ঘ সময় শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় ছিল।

দুদু মিয়ার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তার ঘোষণা ছিল, ‘জমির মালিকানা কৃষকের।’ এই বক্তব্য নির্যাতিত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কৃষকরা তার আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি কৃষকদের ওপর আরোপিত অন্যায় করের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কাজ করেন।

গ্রামীণ সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ফরায়েজি সমাজে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তার অনুমতি ছাড়া কোনো বিরোধ নিয়ে সরকারি আদালতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ফলে স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

আন্দোলন পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের জন্য দুদু মিয়া কয়েকজন ঊর্ধ্বতন খলিফার সমন্বয়ে একটি পরামর্শসভা গঠন করেন। এর মাধ্যমে তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও তত্ত্বাবধান বজায় রাখতেন।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের সময় জমিদার ও নীলকরদের চক্রান্তে ইংরেজ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। ১৮৫৯ সালে মুক্তি পেলেও আবার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কোনো মামলা ছাড়াই তাকে কলকাতার আলিপুরে বন্দি রাখা হয়। ১৮৬০ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার সময় তার স্বাস্থ্য চরমভাবে ভেঙে পড়ে। ১৮৬২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এই আপসহীন নেতা ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। পুরান ঢাকার বংশাল রোডে তাকে দাফন করা হয়।

লেখক : ইসলামি গবেষক