সু-ধারণায় প্রশান্তি, কু-ধারণায় পাপ

আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। মুসলিম ভাইদের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। তাহলে আপনাদের জীবন সুন্দর হবে এবং আপনারা বিপদাপদ ও পাপাচার থেকে নিরাপদ থাকবেন।

কুধারণার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এর ক্ষতি অপরিসীম এবং এর পরিণাম অত্যন্ত বিপজ্জনক। যে ব্যক্তি মন্দ ধারণাকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করে, সে পাপের সাগরে সাঁতার কাটতে থাকে এবং জুলুম ও ব্যাধির অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলে। কারণ মন্দ ধারণা মানুষকে পরনিন্দা ও সীমালঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজুরাত ১২)

মন্দ ধারণার ভয়াবহতার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার উম্মতকে এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, অনুমান সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করো না। বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (সহিহ বুখারি ৬০৬৪)

সৃষ্টির প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা শয়তানের অন্যতম কৌশল। এর মাধ্যমে সে দুর্বল ইমানের অধিকারীদের ধোঁকা দেয়, যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছেড়ে দিয়েছে। ফলে সে তাদের অন্তরে দুশ্চিন্তা, বিষণœতা, উদ্বেগ ও দুঃখ প্রবেশ করায়।

আর সুধারণার মধ্যে রয়েছে অন্তরের পবিত্রতা, হৃদয়ের প্রশান্তি, মনের আনন্দ এবং শরীরের সুস্থতা। এর মধ্যে রয়েছে সুখ এবং সেই একক প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সফলতা লাভ। সুধারণা পরম করুণাময় আল্লাহর বান্দাদের গুণাবলির সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যখন তা শুনলে, তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা নিজেদের সম্পর্কে কেন ভালো ধারণা পোষণ করল না?’ (সুরা নুর ১২)

একজন মুমিনের উচিত, নিজেকে এমন সন্দেহজনক স্থানে না রাখা, যার মাধ্যমে সে শয়তানকে তার ভাইদের সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণের সুযোগ করে দেয়। আর যদি সে বুঝতে পারে যে, অন্যরা তাকে নিয়ে মন্দ ধারণা করছে, তাহলে তার উচিত দ্রুত বিষয়টি পরিষ্কার করা এবং যথাসময়ে ব্যাখ্যা দেওয়া, যাতে মানুষের মধ্যে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়ে যায়।

এটাই আপনাদের নবীজি (সা.)-এর আদর্শ। তিনি সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, বংশমর্যাদায় সর্বাধিক সম্মানিত, অন্তরে সর্বাধিক পবিত্র এবং স্বভাবে সর্বাধিক কোমল ছিলেন।

উম্মুল মুমিনিন সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ইতিকাফ অবস্থায় ছিলেন। এক রাতে আমি তাকে দেখতে গেলাম। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম। এরপর আমি ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে বিদায় দিতে আমার সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। এ সময় আনসারদের দুজন ব্যক্তি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা নবীজি (সা.)-কে দেখে দ্রুত চলে যেতে লাগলেন। তখন নবীজি (সা.) বললেন, তোমরা একটু থামো। ইনি (আমার স্ত্রী) সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই। তারা বললেন, সুবহানাল্লাহ! হে আল্লাহর রাসুল! (আমরা কি আপনার ব্যাপারে কুধারণা করতে পারি?) তখন নবীজি (সা.) বললেন, শয়তান মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের মতো চলাচল করে। আমি আশঙ্কা করলাম, সে তোমাদের অন্তরে কোনো মন্দ ধারণা ঢুকিয়ে দিতে পারে। (সহিহ বুখারি ৩২৮১)

মানুষের জন্য জরুরি হলো তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, প্রিয়জন, কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী ও সমবয়সীদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করা। একইভাবে নিজের রাষ্ট্র ও নেতৃত্বশীলদের সম্পর্কেও সুধারণা পোষণ করা। কারণ, সুধারণা পারস্পরিক বন্ধন, ঐক্য, শক্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উপায়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভেদ সৃষ্টিকারীরা মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় ছড়িয়ে দিতে অত্যন্ত সচেষ্ট থাকে। তারা বিভিন্ন অভিযোগ সাজিয়ে, মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে নানা মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মন্দ ধারণা ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে সমাজে বিভেদ, সংঘাত ও কাঠামোগত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হইও না। তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।’ (সুরা আনফাল ৪৬)

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় করুন এবং মুমিন ভাইদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করুন। নিশ্চয়ই সুধারণা অন্তরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। এটি আমলনামার পাল্লায় অত্যন্ত ভারী এবং পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, মানুষের মধ্যে কে সর্বোত্তম? তিনি বললেন, প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যবাদী ব্যক্তি। সাহাবিরা বললেন, সত্যবাদীকে আমরা চিনি। কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী কে? তিনি বললেন, তিনি এমন ব্যক্তি, যিনি তাকওয়াবান ও পবিত্র। তার অন্তরে কোনো পাপ, সীমালঙ্ঘন, বিদ্বেষ কিংবা হিংসা নেই। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪২১৬)

হে মুসলমানরা! জেনে রাখুন, একজন মুমিন যখন তার মুমিন ভাইদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করেন, তখন তার ইমান নিরাপদ থাকে, তার বিবেক সুরক্ষিত থাকে এবং তার হৃদয় প্রশান্ত হয়। তার মনে যেসব কুমন্ত্রণা ও সংশয় আসে, সেসব তিনি সবকিছুর অধিপতি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেন এবং পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর ভরসা করেন।

যদি মানুষ সম্পর্কে তার সুধারণা সঠিক হয়, তাহলে তার দ্বীন নিরাপদ থাকে, বিবেক স্বস্তি লাভ করে এবং তার উত্তম আচরণের কারণে অন্তর পবিত্র থাকে। আর যদি মানুষ সম্পর্কে তার সুধারণা ভুল প্রমাণিত হয় এবং তাদের কাছ থেকে প্রতারণা, অকৃতজ্ঞতা, ষড়যন্ত্র ও সীমালঙ্ঘন প্রকাশ পায়, তবুও তার জানা উচিত, বান্দাদের অন্তর পরম করুণাময় আল্লাহর দুই আঙুলের মধ্যে রয়েছে। তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেগুলো পরিবর্তন করেন। তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও পূর্বনির্ধারিত ফয়সালা ছাড়া তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মুমিনদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহর ওপরই ভরসা করা।’ (সুরা মুজাদালাহ ১০)

যারা অন্যের ক্ষতি করে, তাদের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের ওপরই ফিরে আসবে। মহান আল্লাহ এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, ‘কু-চক্রান্ত তার পরিকল্পনাকারীদেরই ঘিরে ধরে।’ (সুরা ফাতির ৪৩)

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা যে সুধারণা পোষণ করেছেন এবং যে সুন্দর হৃদয় অন্যকে উপহার দিয়েছেন, সেটার জন্য কখনো অনুতপ্ত হবেন না। পবিত্রতা ও নির্মলতা মহান ব্যক্তিদের চরিত্র। আর মন্দ ধারণা পোষণ করা দুষ্ট লোকদের স্বভাব। তারা মনে করে, তারা অত্যন্ত চালাক ও কৌশলী। অথচ বাস্তবে তারা ধোঁকাগ্রস্ত অজ্ঞ ছাড়া কিছুই নয়।

১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান