সংস্কৃতি

ইরানি ও আরবি রূপকথায় পাহাড়ের সিমুরগ ও মরুর জিন

পারস্যের যুদ্ধের রূপকথা শুধু পারস্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বয়ং নাট্যকার স্কাইলাসও পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও গ্রিক বিজয়ের কাহিনি তার দ্য পার্সিয়ান নাটকে তুলে ধরেছেন। সালামিসের নৌযুদ্ধে গ্রিকদের কাছে পারস্যের পরাজয়, রাজপ্রাসাদে ক্ষমতার অহংকার, ধ্বংস এবং রাজপরিবারের শোকাচ্ছন্ন হাহাকার—নাটকের প্রধান অনুষঙ্গ। ওরিয়েন্টালিজমের সমালোচক এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, স্কাইলাস পারস্যের প্রতি কিছুটা ট্র্যাজিক সহানুভূতি দেখালেও তার মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে পশ্চিমা বিজয়ের শ্রেষ্ঠত্ব উদযাপনের প্রবণতা ছিল। নাটকে গ্রিকদের বুদ্ধিমান, স্বাধীন ও যুক্তিবাদী বিজয়ী হিসেবে এবং প্রাচ্যকে আবেগপ্রবণ, জাঁকজমকপূর্ণ অথচ অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

স্কাইলাসের এই নাটকের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় সাহিত্যে ‘আমরা’ বা পশ্চিম বনাম ‘তারা’ বা প্রাচ্য—এই বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। সাঈদের মতে, পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিচিত্র সংস্কৃতি, ভাষা ও নৃগোষ্ঠীকে একটি একক ‘অরিয়েন্ট’ বা প্রাচ্যের ছাঁচে বন্দি করার প্রবণতা এর মধ্যে কাজ করেছে। অথচ ইরানের পর্বতঘেরা উঁচু মালভূমি এবং আরবের মরুময় বালিয়াড়ি প্রান্তর এক নয়। জিওক্রিটিসিজমের আলোকে স্থান কেবল গল্পের পটভূমি নয়, বরং নিজেই এক সক্রিয় সাহিত্যিক উপাদান। এই দুই ভিন্ন ভূপ্রকৃতির বুকেই গড়ে উঠেছে ভিন্নধর্মী সাহিত্যিক মেজাজ।

সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের ফারসি ও আরবি সাহিত্যকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে একই পাল্লায় দেখা হলেও, তাদের রূপকথা ও পৌরাণিক যুদ্ধে এই পার্থক্যের নন্দনতাত্ত্বিক চিত্রায়ণ স্পষ্ট। পর্বত ও মরুভূমির পরিবেশগত বৈচিত্র্য তাদের মহাকাব্যিক সংঘাতের ধারণাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, সাহিত্যিক আলোচনায় সেই দিকটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ আধুনিক ফ্যান্টাসি সাহিত্যেও এই প্রাচীন কল্পজগতের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

বিশেষ করে পারস্যের সাহিত্যিক মানস গঠনে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং প্রাচীন জরাথুস্ত্রীয় দর্শনের দ্বৈতবাদ গভীর ভূমিকা রেখেছে। আলবুরজ ও জাগরোস পর্বতমালা পরিবেষ্টিত ভূখণ্ডে পর্বত কখনো নিতান্ত পাথরখণ্ড ছিল না, তা ছিল আত্মিক শক্তি, মহাজাগতিক রহস্য এবং প্রতিরোধের কেন্দ্র। আবুল কাসিম ফেরদৌসীর মহাকাব্য শাহনামা এবং বিভিন্ন ফারসি রূপকথায় বর্ণিত যুদ্ধ তাই শুধু সীমানা কিংবা রাজ্য দখলের রাজনৈতিক লড়াই নয়—তা শুভ ও অশুভ শক্তির মধ্যকার বৃহত্তর মহাজাগতিক সংঘাতের রূপও ধারণ করে।

পারস্যের পৌরাণিক রূপকথায় পর্বত হলো মর্ত্য ও স্বর্গের সংযোগকারী এক সেতু। সুউচ্চ আলবুরজ পর্বতের সঙ্গে যুক্ত পৌরাণিক মহাপক্ষী সিমুরগ পরম প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক অভিভাবকত্ব ও সুরক্ষার প্রতীক। শাহনামায় এই সিমুরগ পরিত্যক্ত শিশু জালকে লালন-পালন করে, যে পরবর্তীকালে বীর রুস্তমের পিতা হয়। বিপদের সময় জাল সিমুরগের একটি পালক আগুনে পোড়ালেই সে সাহায্যে হাজির হয়। ফলে সিমুরগ কেবল অলৌকিক প্রাণী নয়, বীরত্ব ও ন্যায়ের এক অতিলৌকিক অভিভাবকও।

ফারসি সুফি সাহিত্যে সিমুরগ আরও গভীর প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ফরিদ উদ্দীন আত্তারের ‘মানতিকুত তায়ির’ বা ‘পাখিদের বিধানসভা’য় সিমুরগ পরম সত্যের প্রতীক; তাকে অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আত্মা নিজের অস্তিত্ব ও সত্যকে উপলব্ধি করে। অর্থাৎ পারস্যের পৌরাণিক কল্পনায় পাহাড়ের উচ্চতা, সিমুরগের অবস্থান এবং আত্মিক উৎকর্ষ—এই তিনটি ধারণা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

ফেরদৌসীর শাহনামায় আধিভৌতিক সত্তার উপস্থিতিও জরাথুস্ত্রীয় দ্বৈতবাদী দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহাকাব্যের অন্যতম প্রধান সংঘাত ইরান ও তুরানের ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব। এখানে ইরান আলো, সভ্যতা ও সত্যের ধারক; আর তুরান অন্ধকার ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক। ফারসি পৌরাণিক সাহিত্যের ‘দিভ’ মিথ্যা ও আত্মিক অন্ধকারের মূর্ত রূপ। কায়ানি রাজারা যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন ঈশ্বরপ্রদত্ত পবিত্র জ্যোতি বা ‘ফরহ্’ দ্বারা চালিত হয়ে। ফলে তাদের সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য নয়, ‘আশা’ বা মহাজাগতিক সত্য রক্ষার পবিত্র ব্রত হিসেবেও প্রতিভাত হয়।

এই মহাকাব্যিক যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ রুস্তমের ‘হাফ্ত খাঁন’ বা ‘সপ্ত-অভিযান’। সেখানে তাকে মায়াবী ড্রাগন, জাদুকরী শক্তি এবং ভয়ংকর ‘দিভ-ই সেপিদ’ বা সাদা দানবের মুখোমুখি হতে হয়। এসব অভিযান বাহ্যিক লড়াইয়ের পাশাপাশি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মানবিক ও আধ্যাত্মিক বিজয়ের রূপক। তবে পারস্যের মহাকাব্য কেবল বীরত্ব ও বিজয়ের জয়গান নয়। রুস্তম ও তার অজ্ঞাতপুত্র সোহরাবের মর্মান্তিক সংঘাত দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের অন্ধ বিভ্রান্তি কীভাবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ট্র্যাজেডির জন্ম দিতে পারে।

পারস্যের এই দ্বৈতবাদী কাঠামোর চেয়ে ভিন্ন প্রতীক উপস্থাপন করে আরবি এবং মরুময় উপদ্বীপের লোকগাথা। আরবি সাহিত্যে, বিশেষ করে এক হাজার এক রজনী বা আলিফ লায়লার বিস্তৃত কল্পজগতে আধিভৌতিক জগতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হলো জিন এবং তার পরাক্রমশালী রূপ মারিদ। ধোঁয়াহীন আগুনে সৃষ্ট এই অলৌকিক সত্তারা পরম শুভ বা পরম অশুভের নির্দিষ্ট ছকে বন্দি নয়। তারা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী; যেমন দয়ালু ও সহায়ক হতে পারে, তেমনই প্রতিশোধপরায়ণ ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

জিনের এই দ্বিমুখী স্বভাবকে অনিয়ন্ত্রিত ও নির্মম মরুপ্রকৃতির প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা যায়। বিশাল মরুপ্রান্তরের নিঃসঙ্গতা, বালুঝড়ের তাণ্ডব, পথ হারানোর ভয় এবং চোখের আড়ালে থাকা অদৃশ্য বিপদ—এসব অভিজ্ঞতা আরবি সাহিত্যিক কল্পনায় জিনের গল্পে রূপ পেয়েছে। আলিফ লায়লার অলৌকিক প্রদীপ, জাদুকরী আংটি কিংবা উড়ন্ত কার্পেটের কাহিনিতেও মানুষের দৃশ্যমান জগতের বাইরে থাকা অদৃশ্য ক্ষমতার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

আরব লোকগাথায় জিনের নানা রূপ রয়েছে। ইফরিত শক্তিশালী, রূপ পরিবর্তনকারী ও চালবাজ সত্তা; মারিদ বিশাল আকৃতির পরাক্রমশালী জিন, যার সঙ্গে সমুদ্র বা জলাশয়ের সম্পর্ক পাওয়া যায়; আর ঘুল মরুভূমির নির্জন প্রান্তর ও কবরস্থানে ওত পেতে থাকা ভয়ংকর পিশাচসত্তা। এসব চরিত্রে মরুভূমির ভয়, রহস্য এবং অজানার প্রতি মানুষের বিস্ময় একসঙ্গে কাজ করেছে।

সিমুরগ ও মরুর জিনের সত্তাগত বৈশিষ্ট্যেই পারস্য ও আরব সংস্কৃতির ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিন্নতা সবচেয়ে স্পষ্ট। সুউচ্চ পর্বতে বসবাসকারী সিমুরগ প্রজ্ঞা, দয়া, পবিত্রতা ও সুরক্ষার প্রতীক। বিপরীতে মরুর জিন অনিশ্চয়তা, ভয়, রহস্য এবং অদৃশ্য শক্তির প্রতীক। একদিকে পাহাড়ের উচ্চতা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মিক উৎকর্ষের কল্পনা, অন্যদিকে মরুর অসীমতা থেকে জন্ম নেওয়া অজানার আতঙ্ক—দুই ভূপ্রকৃতি দুই ধরনের পৌরাণিক নন্দনতত্ত্ব তৈরি করেছে।

ইরানের রূপকথা, শাহনামা এবং সুফি সাহিত্যে বীরত্ব, ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা ও আত্মোপলব্ধির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। আরবি রূপকথার জগতে মরুভূমির দীর্ঘ রাত, বাণিজ্য কাফেলা, সিন্দবাদের সমুদ্র অভিযান, জিন ও জাদুর নানা উপকরণ মিলে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক কল্পলোক। ফলে দুই ধারার পৌরাণিক সংঘাতের ভেতরেও মানুষের প্রকৃতি ও অজানাকে বোঝার দুটি পৃথক পদ্ধতি কাজ করেছে।

প্রাচীন পারস্যের মহাকাব্যিক সংঘাত ও আরবি লোকগাথার পৌরাণিক চরিত্রগুলো এখন আধুনিক সাহিত্য, কমিকস, গ্রাফিক নভেল, অ্যানিমেশন ও ভিডিও গেমেও নতুনভাবে ফিরে আসছে। সমকালীন লেখক ও শিল্পীরা মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন পৌরাণিক উপাদানকে আধুনিক ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশনের সঙ্গে যুক্ত করছেন। সৌদি লেখক ইব্রাহিম আব্বাস ও ইয়াসির বাহজাতের উপন্যাস হওজন-এ ঐতিহ্যবাহী মরুর জিন ও আধিভৌতিক কাহিনিকে কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং সমান্তরাল বিশ্বের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কমিকস ও গ্রাফিক নভেলেও শাহনামার আলবুরজ পর্বত, সিমুরগ, রুস্তম এবং দিভ-ই সেপিদের মতো চরিত্র নতুন দৃশ্যভাষা পাচ্ছে। জরাথুস্ত্রীয় ‘আলো বনাম অন্ধকার’-এর মহাজাগতিক দ্বন্দ্ব আধুনিক অ্যাকশন ও বীরত্বগাথার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশনেও রুস্তম-সোহরাবের মতো বিয়োগান্তক যুদ্ধ কিংবা আরবের মরুময় বীরত্বগাথা নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে লর্ড অব দ্য রিংস বা হ্যারি পটার-কেন্দ্রিক পশ্চিমা ফ্যান্টাসির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিজস্ব পৌরাণিক নন্দনতত্ত্বও বিশ্বজুড়ে নতুন পরিচয়ে হাজির হচ্ছে।

সমকালীন শিল্প ও সাহিত্যে এই পৌরাণিক যুদ্ধের পুনঃপ্রয়োগ কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেদের সাহিত্যিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন ভাষায় আবিষ্কারেরও একটি মাধ্যম। বাস্তব জীবনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে সাহিত্য, কমিকস বা ভিডিও গেমে পৌরাণিক শুভ-অশুভের প্রতীকী যুদ্ধ মানুষের কল্পনা ও শিল্পবোধের জন্য ভিন্ন এক ক্ষেত্র তৈরি করে।

বাস্তব জগতের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বহু ঊর্ধ্বে অবস্থান করে পারস্যের সুউচ্চ পর্বতের সিমুরগ কিংবা আরবের ধু-ধু মরুর জিন—উভয় কল্পনাই শেষ পর্যন্ত মানবাত্মার সংকট, ভয়, প্রজ্ঞা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন সংগ্রামের দুই ভিন্ন রূপক। আধুনিক অনুবাদ ও তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে এই দুই সমৃদ্ধ ধারাকে পাশাপাশি পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যিক কল্পনার বৈচিত্র্য এবং গভীরতর সাংস্কৃতিক মানস আরও বিস্তৃতভাবে অনুধাবন করা সম্ভব।