অবকাঠামোগত সংকটে ধুঁকছে নেত্রকোনার পর্যটন

পাহাড়, নদী আর হাওরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোনা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক স্বর্গরাজ্য। বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদী আর পাঁচগাঁওয়ের সবুজ ঢেউখেলানো রূপ প্রতি বছরই হাজারো পর্যটককে টানে। তবে পরিকল্পনা ও সঠিক অবকাঠামোর অভাবে এখনও কাঙ্ক্ষিত রূপ পায়নি এই সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটন এলাকা হলেও যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন ও নিরাপত্তার দিক থেকে জেলাটি পিছিয়ে রয়েছে। অথচ সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাত আঞ্চলিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

পর্যটকদের মূল আকর্ষণ সুসং দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী ও সাদা মাটির রঙিন পাহাড়। সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলে সাঁতার কাটা কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রূপ উপভোগ করা প্রধান আকর্ষণ।

এছাড়াও রয়েছে সুসং রাজার ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, রানীখংয়ের শতবর্ষী সেন্ট যোসেফের ধর্মপল্লী, কমলা রানীর দিঘি, টঙ্ক আন্দোলনের মহানায়ক কমরেড মনি সিংহ স্মৃতি জাদুঘর এবং কেন্দুয়ার সুলতানী ও মুঘল আমলের ঐতিহ্যবাহী রোয়াইলবাড়ি দুর্গ। মদন, খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জের বিশাল হাওর অঞ্চল, বিশেষ করে বর্ষার ডিঙাপোতা হাওর প্রকৃতির এক অনন্য রূপ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া কলমাকান্দার পাঁচগাঁও পাহাড়ের ঢেউখেলানো সৌন্দর্য, মহাদেও নদী, চিংনীর বঙ্গটিলা ও গ্রামীণ পরিবেশ পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামোগত ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ দর্শনার্থীরা। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো দোকানপাট গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক রূপ নষ্ট হচ্ছে এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পর্যটন এলাকাগুলো উন্মুক্ত রাখা, যাতায়াত সুগম করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

দুর্গাপুরের সাদামাটির পাহাড়ে ঘুরতে আসা শাহীন আলম বলেন, এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। কোনো নিয়মকানুন ছাড়াই যত্রতত্র দোকানপাট গড়ে উঠছে এবং আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় চারপাশ নোংরা হচ্ছে। অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে স্থানটির আদি সৌন্দর্য ও প্রশান্তি হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা দরকার।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, নেত্রকোনায় পর্যটনের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি প্রকৃতির এক 'হিডেন ট্রেজার'। তিনি ডিসি সম্মেলনেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে এটি দেশের অন্যতম প্রধান ট্যুরিজম হাবে পরিণত হবে। এছাড়া যত্রতত্র দোকান গড়ে ওঠার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জানান, নেত্রকোনায় পর্যটনের সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শ্রীহট্ট বা সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের তুলে ধরা প্রস্তাবনার পাশাপাশি পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ডিও প্রদান করা হয়েছে। খুব শিগগির মন্ত্রীর পরিদর্শনের আগে একটি প্রতিনিধি দল এলাকা পরিদর্শন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করবে এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।