বহুদিন পর আবার বুকের ভেতরের টিপ টিপ অনুভূতিটা ফিরে এসেছে। কৈশোরে প্রেমে পড়ার পরই এমন একটা বিরল ঘটনা জীবনে প্রথম ঘটেছিল। এরপর আরেকবার বুকের ভেতর টিপ টিপ করেছিল বিয়ের ঠিক আগে। তবে সেটা যতটা না রোমাঞ্চকর ছিল, তারচেয়ে বেশি ছিল ভয় আর অনিশ্চয়তার মিশেলে মাখা। কৈশোরের সেই প্রথম প্রেম পুরো জীবনটাকেই এলোমেলো করে দিয়েছিল। মিখিল চোখ বন্ধ করে একবার সেই উথাল-পাথাল দিনগুলোর উত্তাপ অনুভব করার চেষ্টা করে। বুকের ভেতর ধপ করে আগুন জ্বলে ওঠে। মিখিল যেন চোখের সামনে দেখতে পায় সেই আগুনে দুই হাত গরম করার চেষ্টা করছে এক দেবী। মিখিল তখন জীবনপুর স্কুলের সুবোধ ছাত্র। প্রচণ্ড লাজুক আর অন্তর্মুখী প্রকৃতির। মেয়েদের দেখলে আড়ালে লুকায়। কিন্তু মধ্য মাঘের এক সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে আগুনের খুব কাছে এই দেবীকে দেখে তার বুকের ভেতরটা ওলট-পালট হয়ে যায়। সেবারই প্রথম বুকের ভেতর টিপ টিপ অনুভূতিটা টের পায়। মনে হচ্ছিল মানবী নয়, সাক্ষাৎ কোনো দেবী নেমে এসেছে ধরায়। আগুনের কুণ্ডলীর কাছাকাছি এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় মিখিল। দেবীর পাশে দাঁড়িয়ে নিজেও আগুনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। দেবীর কিছুটা ইতস্তত ভাব। পাশে দাঁড়ানো বান্ধবীকে স্কুলের পথে হাঁটতে তাড়া দিচ্ছে। দুজনেরই একই স্কুল। এক ক্লাস জুনিয়র। স্বভাবের গণ্ডি ভেঙে মিখিল প্রথমবার কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। সেই কথাও ছিল নিতান্ত প্রকৃতিকেন্দ্রিক। ‘আজকে অস্বাভাবিক ঠান্ডা পড়েছে, হাত-পা অবশ হওয়ার জোগাড়।’ দেবী সম্মতি প্রকাশ করে বান্ধবীর সঙ্গে স্কুলের দিকে পা বাড়িয়েছিল। মিখিল আরও কিছুক্ষণ অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেও স্কুলের দিকে পা বাড়ায়। তারপর প্রায় প্রতিদিন মিখিল একই জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু দেবীর দেখা মেলে না। মাঝে মাঝে ক্লাসে গিয়েও দেবীকে দেখার চেষ্টা করে। তত দিনে দেবীর নামও জানা হয়ে যায়। কিন্তু সেদিনের আগুনের পাশে দেখা দেবী এ নয়, অনেকের মধ্যে মিশি থাকা সাধারণ মিহিকাকে দেখে কিছুটা নিরাশ হয় মিখিল। তবুও সে দেবীকে মনে মনে নৈবেদ্য অর্পণ করে যায়।
তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখে মিখিল। কোন গোপন কুঠুরিতে তত দিনে মিলিয়ে গেছে মিহিকা। কাকতালীয়ভাবে আরেক শীতের সকালে ঠান্ডায় জমে থাকা হাত ঘষতে ঘষতে টং দোকানের দিকে যাত্রা করেছে মিখিল। হঠাৎই উল্টো দিকে আগুনের কুণ্ডলীর পাশে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুই দুরন্ত তরুণীর দিকে তার দুচোখ স্থির হয়ে যায়। থমকে দাঁড়ায় মিখিল। কিছুটা এগিয়ে নিশ্চিত হয় সে। আগুনের পাশে আবারও কৈশোরের দেবী মিহিকাকে দেখে মিখিল রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে সে। মিহিকাও বিস্মিত চোখে মিখিলের চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকে। দুই ভাষাহীন মানব-মানবী এবার সত্যিই একে অন্যের প্রেমে পড়ে। কিন্তু সে-ও কেবল বছরখানেকের জন্য। একদিন হঠাৎ করেই দেবীর অন্তর্ধান। পরে জানতে পারে, পরিবারের চাপে তাকে বিয়ে করতে হয়েছে। মিখিল আর মিহিকার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো চেষ্টা করেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষে মিখিল এখন চাকরিজীবনে। আর কোনো দেবীর দিকে সে ফিরে তাকায়নি। এত দিনে মিখিল এটুকু বুঝে গিয়েছে, দেবীরা সুরলোকেই সুন্দর, বাস্তব জীবনে তারা বড় বেমানান। ফলে পরিবারের পছন্দেই মিখিলকে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে। নারীর প্রতি অতীত অভিজ্ঞতা এ প্রবেশদ্বারের ব্যাপারেও তাকে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। দিন যত গড়িয়েছে সেই ভীতি বেড়েছে বই কমেনি। কারণ একপর্যায়ে মিখিল বুঝতে পেরেছে, তার স্ত্রী হয়ে যে নারী তার সংসারে প্রবেশ করেছে তারও জীবনে রয়েছে একটা প্রেমময় অতীত। সেই অতীত এতই জীবন্ত যে তার স্ত্রী সেটিকে অতীত হিসেবেই মেনে নিতে পারেনি। প্রতিনিয়ত তাই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। শুরুর দিকে নিখিল বুঝিয়ে শুনিয়ে পৌষীকে পোষ মানানোর চেষ্টা করেছিল। স্ত্রীর বিভিন্ন বৈষয়িক আবদার ও আহ্লাদ যতটা সম্ভব পূরণ করেছে উদার হাতে। কিন্তু স্ত্রীর অতীতমুখী বর্তমানের সঙ্গে মিখিলের নিজস্ব বাস্তবতার টানা হ্যাঁচড়া চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সেই ভূলুণ্ঠিত বর্তমানে মিখিলের প্রবেশাধিকারই ছিল না। তার স্ত্রীর কাছে জীবন আর সুখের মানেই হলো সেই প্রেমময় অতীত। বাধ্য হয়ে একসময় মিখিল হাল ছেড়ে দেয়।
বছর না ঘুরতেই পৌষী পালিয়ে যায়। অবশ্য অনেক দিন থেকেই অফিস থেকে ফেরার সময় মিখিলের মনে হতো বাসায় গিয়ে দেখবে পৌষী নেই। প্রতিদিন বাসায় পৌঁছে স্ত্রীকে দেখে সে অবাকই হতো। আবার তার অবাক হওয়াও যে পৌষীর চোখে ধরা পড়েনি, তাও নয়। পরে বুঝেছে, স্ত্রীর ভাবলেশহীন সহযাপন অপর প্রান্ত থেকে কাঙ্ক্ষিত ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। নিজের কিছু গয়না ছাড়া তেমন কিছু নিয়ে যায়নি। মিখিলের জন্য ছিল একটা ছোট চিরকুট—‘আমাকে খোঁজার দরকার নেই।’ এটুকু ভদ্রতার জন্য মনে মনে পৌষীকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারে না মিখিল। চিরকুটটা রেখে না গেলেও আরও কিছু পুলিশি ঝামেলা পোহাতে হতো।
ধীরে ধীরে মিখিল নিজের ভেতরে গুটিয়ে যেতে থাকে। এক সময় নিজের একাকিত্ব উপভোগ করতে শিখে যায়। কিন্তু সেই স্বস্তিও বেশিদিন স্থায়ী হয় না। একদিন অফিসের কাজ শেষে বের হওয়ার সময় তার কাছে একটা ফোন আসে। আননোন নাম্বার। ধরবে কি ধরবে না, ভাবতে ভাবতেই রিসিভ করে ফেলেছে। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো মিষ্টি এক সুরেলা কণ্ঠস্বর—‘কেমন আছো মিখিল?’
প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে যেন হঠাৎ বৃষ্টির পরশ অনুভব করে মিখিল। পরিচিত কণ্ঠস্বর, তবুও মিখিল ঠিক চিনতে পারছিল না। অপরপ্রান্ত থেকেই রহস্যের জোট খোলা হয়—‘তোমার কৈশোরের দেবীকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?’
জানতে পারে স্বামীর সঙ্গে মিহিকার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে কিছুদিন আগে। মিখিলকে সে কখনো ভুলতে পারেনি, এ কথাও দৃঢ়ভাবেই পুনর্ব্যক্ত করে মিহিকা। মিখিল তখন ভাবে, মিহিকার সংসার ভাঙার পেছনে কি তবে সে-ই দায়ী? এই অতীতের অমোঘ আকর্ষণই কি পৌষীকে ঘরছাড়া করেনি? আজকের অতীতই তো একসময় ঘোরতর বর্তমান ছিল। সেখানে কি শুধু সুখ, অপ্রাপ্তি আর যন্ত্রণাও তো কম ছিল না। কিন্তু সময়ের ব্যবধান অতীতকে সব কলুষতা থেকে মুক্তি দিয়ে শুধু সুখস্মৃতির সলতেটুকু উসকে রাখে। ফলে মানুষ কী অবলীলায় পতঙ্গের মতো অতীতের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হায় অতীত!
অপরপ্রান্তে মিহিকার কণ্ঠ তাকে আবার সচকিত করে তোলে। মিহিকা দেখা করতে চায়। মিখিল প্রতিটি শব্দের আয়নায় আগুনের পাশে দেখা দেবীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। যার আবেদনে সাড়া না দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
এরপর জীবন যেন আবার অতীতমুখর হয়ে উঠল। মিখিল কফির কাপ সামনে রেখে মিহিকার দিকে তাকিয়ে ভাবে, এই তো সেই দেবী, আগুনের পাশে দাঁড়ালে যার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। যদিও মিহিকার চেহারায় আগের সেই কমনীয় ভাব নেই। জীবনের পথে চলতে গিয়ে বহু হোঁচট খাওয়ার চিহ্ন লেগে আছে তার চোখে মুখে। কিন্তু তবুও এ তো সেই নারী যাকে একসময় মনে হয়েছিল পরম প্রার্থিত। মিখিলের স্ত্রী চলে গেছে জেনে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেখা তার ঠোঁটে জেগে উঠেছিল। সেটা করুণার নাকি স্বস্তির তা ঠিক বোঝা যায়নি। এরপর প্রায় নিয়মিতই দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ হতে থাকে। সত্যিই যেন মিখিল তার কৈশোর জীবনের উচ্ছ্বাস ফিরে পায়। বুকের ভেতরের টিপ টিপ অনুভূতিটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। এক সময় ওরা সিদ্ধান্ত নেয়, বিয়ে করবে। বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক হয়। মিখিল ভেতরে ভেতরে ক্রমে কিশোর হতে থাকে। এবার বুঝি সত্যিই তার কৈশোরের দেবী ঘরে পা রাখবে ঘরণী হয়ে। বিয়ের কেনাকাটা থেকে শুরু করে অন্যান্য আয়োজনও প্রায় সম্পন্ন করে ফেলে অল্প সময়ের মধ্যে। বিয়ের দিনটা কোনো এক রবিবারে স্থির হয়। কারণ এই দিনেই দেবীকে সে দ্বিতীয়বার আগুনের পাশে দেখেছিল। মিখিলের বুকে সুখের এক অজানা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। জীবনটাকে মনে হচ্ছে সত্যিই সুন্দর।
বহুল প্রতীক্ষিত সেই রবিবার। সারা রাত উত্তেজনা আর অস্থিরতায় ঘুমাতে পারেনি মিখিল। ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছে। ঘুম ভাঙে কলিংবেলের ব্যস্ত শব্দে। চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দেখে, তার সামনে পৌষী দাঁড়িয়ে!
মিখিল প্রথমে ভাবে ঘুমের ঘোরে বোধহয় ভুল দেখছে। কয়েকবার চোখ কচলে আবার তাকিয়ে দেখে—না, দেখায় একদমই কোনো ভুল নেই, এ যে সত্যিই পৌষী! কিছু বোঝার আগেই পৌষী মিখিলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে আঁকড়ে ধরে। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘ও একটা প্রতারক মিখিল। প্লিজ তুমি আমাকে মাফ করে দাও।’ বিস্মিত মিখিল কী বলবে কিছু ভেবে পায় না। এদিকে মুঠোফোনে মিহিকার কল আসছে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মিখিলের মনে হয়, অতীত কি তবে আসলেই প্রহেলিকা? মিহিকার ফোন কেটে দিয়ে শক্ত করে পৌষীকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মিখিল।