চুয়েটে দুই পক্ষই অনড়

সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে একটা পক্ষ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (চুয়েট) অচল রাখতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হচ্ছে। শিগগির তিনি ক্যাম্পাসে ফিরবেন। গতকাল সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন নতুন উপাচার্য। তবে শিক্ষার্থীরা বলেছেন, অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বীয় পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাদের শাটডাউন কর্মসূচি চলবে।

গত ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২১ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে অসন্তোষের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করেন কয়েকশ শিক্ষার্থী। ২২ সেপ্টেম্বর সকালে উপাচার্যের পদ থেকে অধ্যাপক আবু সায়েমকে অপসারণের প্রতিবাদে এবং তাকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। টানা সাত দিন ধরে চলা এই আন্দোলনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষকরাও। দুই দিন ধরে তারা সর্বাত্মক কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করছেন।

নতুন উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা। এখানে ভিন্নমত থাকবেই, এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। চুয়েটে এই ভিন্নমতটা আসছে জানার একটা ঘাটতি অথবা আস্থার ঘাটতি থেকে। এর সমাধানে দরকার উন্মুক্ত এবং উদার মন-মানসিকতা নিয়ে আলোচনা। আমাদের শিক্ষক সমাজ বা ছাত্রসমাজ যদি আলোচনার প্রক্রিয়াটা উন্মুক্ত করত, তবে খুব দ্রুত আমরা একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারতাম। আজ আমাদের তৃতীয় কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। ছাত্রদের বিভিন্ন গ্রুপ, ব্যাচভিত্তিক প্রতিনিধি ও ক্লাবের প্রতিনিধি আমার সঙ্গে এসে দেখা করে গেছে। তারা আন্দোলনের শুরুতে ছিল। আমি তাদের আশ্বস্ত করতে পেরেছি, একাডেমিক কার্যক্রম খুব সুন্দরভাবে চলবে। আজ অনেক সিনিয়র শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কথাবার্তা ইতিবাচকই মনে হয়েছে। তারা দ্রুত ক্লাসে ফিরতে চান।’ 

ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘চুয়েট বাংলাদেশের ভেতরে একটা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র চাইলে সেখানে যে কাউকেই নিয়োগ দিতে পারে। এখানে আইনগত কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তার ওপর আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। বিভিন্ন কমিটিতেও আমি আছি।’ ছাত্র-শিক্ষকের অনেকেই যোগাযোগ করলেও কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা না যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘যারা আমার কাছে আসছে তারা সাধারণ শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থী। তাদের মাঝে একটা লাজুকভাব থাকে। তারা মনে করছে মিডিয়ার সামনে দাঁড়ালে এটা বুঝাবে তারা একটা পক্ষের। তারা সঠিক অবস্থানে থাকলেও একটা পক্ষের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং পরবর্তীতে ট্যাগিংয়ের ভয় থেকে সামনে আসছেন না। তারা আমাকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন এবং অভিনন্দন জানিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছেন।’

চলমান আন্দোলনের মধ্যেই আপনি ক্যাম্পাসে যাবেন কি না জানতে চাইলে ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আমি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার আছেন। প্রশাসনিক বিষয় আছে। আমরা সবার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করছি। আমরা মোটামুটি একটা ভালো পর্যায়ে আছি। আশা করছি অতিদ্রুত সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করব।’ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার নিয়মিতই যোগাযোগ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন ‘তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, চলমান সমস্যা নিরসনে তারাও বিভিন্নভাবে কাজ করছেন।’

ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আন্দোলনের প্যাটার্ন দেখে আমার মনে হয় একটা পক্ষ ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা তৈরি করতে চাচ্ছে, যাতে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। তাদের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক না, সরকারকে বিব্রত করতেই এই ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা। সরকার কাকে কখন কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেবে, এটা একেবারেই সরকারের নিজস্ব বিষয়। এটা রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত একটা সরকার একজনকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন। তাকে যোগ্য বলেই তো নিয়োগ দিয়েছেন।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবাই সমান। আমার প্রধানতম কাজ একাডেমিক কার্যক্রমকে সমুন্নত রাখা। আমি শিক্ষার্থীদের অভয় দিয়ে বলতে চাই, কেউই একাডেমিক এবং প্রশাসনিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’

তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম স্বীয় পদে পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। 

চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সংলাপে বসার আহ্বান পাইনি। সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো অংশীজন যেমন ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা আচার্যের দপ্তর; কোনো পক্ষ থেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। নতুন উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয় না।’