জীবনার্থ সন্ধান যদি ঔপন্যাসিকের প্রধান লক্ষ্য হয়, তবে যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবির বয়ান তুলে ধরাই তার একমাত্র কাজ হতে পারে না। মানুষের প্রাকৃতিক অস্তিত্ব সন্ধান, নশ্বর, অর্থহীন জীবনের প্রতিমান নির্মাণ, ভাষিক সংস্কৃতি ও মতাদর্শের সমন্বিত সামগ্রিকতা পাওয়া যায় উপন্যাসের আর্টে। মিখাইল বাখতিন তার ডায়ালজিক ইমাজিনেশন (১৯৯৪) গ্রন্থে ভাষাকে দেখেছেন ব্যক্তির অস্তিত্বের (এগ্জিস্টেন্স) ঘোষক হিসেবে। ব্যক্তির কর্তৃত্ব, রচয়িতার একক আধিপত্য স্বীকার করে সারা পৃথিবীতে উপন্যাস বিশ্লেষণের যে ধারা বা রীতি বিরাজমান রয়েছে, বাখতিন তার বহুস্বরতার ধারণা দিয়ে, সেটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছেন। উপন্যাসে যে বহুস্বর একীভূত হয়, তাকে ‘পলিফনি’ এবং বহুবাস্তবতার সমন্বিত বাস্তবতার মাধ্যমে তৈরি হয় ‘হেটারোগ্লসিয়া’ যাকে বলা যায় ‘সংলাপায়িত বচন পাঠতত্ত্ব’। শামসুদ্দীন আবুল কালামের (১৯২৬-১৯৯৭) কাশবনের কন্যা (১৯৫৪) পাঠ প্রসঙ্গে বলা যায়, সামাজিক বহুস্বর ও বহুবাস্তবতাকে ধারণ করা সম্ভব একমাত্র উপন্যাসেই। কারণ, সামাজিক বহুস্বরের প্রতিটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তারা একত্রে ক্রিয়া করে একটি শৈল্পিক মুহূর্ত তৈরি করে।
কাশবনের কন্যা উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ের পূর্বে লোকসংগীত এবং জয়নুলের স্কেচ জুড়ে দেওয়ার মধ্যে গ্রামবাংলার গরিব মাঝি, চাষি, গায়ক কবির জীবনধারা, বিশ্বাস-সংস্কারের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন—‘সকল কবিকুলের প্রতি’। উপন্যাস তো গদ্যের সন্তান, তাহলে কবি বা গীতিকারের প্রতি এই ঔপন্যাসিকের পক্ষপাত কেন? আসলে উপন্যাসের বঙ্কিমী মডেল, ইউরোপীয় কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে দেশজ রীতিতে তিনি উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, নদী-নৌকা, উজান-ভাটি, ঢেউ দোলানো তরঙ্গায়িত সুরের আশ্চর্য জাদুমাখা টানের মধ্যে একটা মায়া আছে। উদার আকাশ এখানকার মানুষকে উদাস-বাউল-বৈষ্ণব, ভাববাদী করেছে। উপন্যাসের ঔপনিবেশিক মডেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বাংলার শিকড়ের প্রাণশক্তিকে উপন্যাসের কাঠামোতে বিন্যস্ত করতে চেয়েছেন। এটা বিভাগোত্তর বাংলাদেশের উপন্যাসের নিজস্ব স্ট্রাকচার বা কাঠামো বলা যায়। প্রথম গীতে তার উদাহরণ পাওয়া যায়—‘বঁধূর রূপ দেখিয়া হইয়াছি পাগল/ ঔষধে আর মানে না/ চল সজনি যাই লো যমুনায়/ গৌর অঙ্গ ভুজঙ্গ হইয়া বুঝি/ দংশি যাচ্ছে আমার গায়/ চল সজনি যাই লো যমুনায়/ প্রেমের বিষে যখন তখন/ বঁধূর বিষে প্রাণ যায়/ চল সজনি যাই লো যমুনায়।’ উপন্যাসের শুরু হয় এক হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিয়ে—
‘বধূ আমি ভুবন ভ্রমিয়া অবশেষে জানিয়াছি জননী জন্মভূমি বাস্তবিকই স্বর্গাদপি গরিয়সী। যত মালিন্য তাহার অঙ্গে থাকুক, এই মাটি আমার আপন মা... ভালোবাসা ব্যাপ্ত হয়, কখনো কন্যার জন্য, কখনো রূপাতীত আরও ব্যাপকতর কাহার জন্য। তখন কেবল আর মন বাঁধা পড়িয়া থাকিতে চাহে না আত্মসুখে, আসে নিজেকে বিলাইয়া বিশ্বপ্রেমে পাগল হইবার উন্মাদনা।... এই দেশ এই মানুষ, এই প্রকৃতি জীবনের এক তুলনাহীন রূপ, এই প্রেম জীবনের প্রতি প্রেমেরই কঠোর কোমল অধ্যায়। (পৃ.৮-১৭)
এই ভূমি আর জলাজল মাটিলগ্ন মানুষের প্রত্যক্ষ জীবন-অভিজ্ঞতার শৈল্পিক আকল্পই শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাশবনের কন্যা। মূল চরিত্র কবিয়াল কানু শিকদারের সুরেলা কণ্ঠে—‘কন্যা তোমা মতি বোঝন ভার/ তুমি একূল ভাঙিয়া ওইকূল সাজাও/ ক্ষণেক হাসাও ক্ষণেক কাঁদাও/ এমন করিয়া খুশি মিটাও কার/ কন্যা তোমার মতি বোঝন ভার।’ নদীর ঢেউ আর যাপিত জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে এই প্রেমময় সুরের গীতলতা। শিকদার এবং হোসেন দুজনই যেন আত্মভোলা, উদাসী ও জীবন পলাতক স্বভাবের মানুষ। মাছ শিকারের মৌসুমে মাছ শিকারে মেতে ওঠে। মাছ শিকারের ফাঁকে দুজনের সংলাপ—
: তুমি কও একটা বিয়া করলে কেমন হয়?
: করবে না।
ঐ যে কথায় বলে ‘নিজের শোওয়ার নাই জাগা, হাউজ করছে কবিলারে সাধা। মোরগো মতো মানুষ হাওলাদার, যাগো চাল নাই, চুলা নাই, বোঝলা হাওলাদার, তাগো কেউ মাইয়া দেয় না। মাইয়ার বাপেও না, মাইয়ারাও আংডি-চুংডি হেন-তেন না পাইলে বিয়া বইবে না।’ (পৃ. ২০)
কাশবন কন্যা—জোবেদা, মেহেরজান, সখিনা, শুভ্র-অপরূপ হলেও পারিবারিক-সামাজিক-ব্যক্তিক নানা অভিঘাতে তাদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ভেঙেপড়া কাশবনের রূপকে রূপকায়িত। কোনো বানিয়ে তোলা বাস্তবতা নয়, নদীর কূলে ভেঙেপড়া কাশবনের মতোই উপকূলের নারীদের জীবনমূলের মাটি বিধ্বস্ত, ভেঙেপড়ার রূপকাশ্রয়ে তুলে ধরা হয়েছে জোবেদা, সখিনা, মেহেরজান কন্যাদের।
সখিনা ছিল হোসেনের বাল্যকালের খেলার সাথি। জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের কারণে তার বাপ মুজাফফর অন্য গ্রামে গিয়ে অন্যের ভূমিতে বসবাস শুরু করে। হোসেন সখিনার প্রতি প্রবল অনুরাগ-বলেই একদিন ইলিশ মাছ নিয়ে তাদের বাড়িতে যায়। সখিনার মার এবং সখিনার আগ্রহ দেখে হোসেনের মনে নতুন আশা জাগে। এই সম্পর্কের পরিণতির জন্য কানু শিকদারকে সখিনার বাড়িতে পাঠায় কিন্তু ফিরে এসে শিকদার জানায়, হোসেনের সঙ্গে সখিনার পরিণয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। সখিনার বিয়ে অন্য জায়গায় ঠিক হয়ে আছে। ‘রাজি না হইয়া উপায় বা কী ছিল? যারা তারে ঠাঁই দিছে, কাজ দিছে রিজিকের, তারাই স্বয়ং সম্বন্ধ দিছে। এ রকম প্রতিপক্ষের সঙ্গে বাদ-বিসস্বাদের সাধ্য কেউর হইবে না।’ (পৃ.৪৮) কানু শিকদার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে সখিনার বাড়ি থেকে ফেরার পথে গঞ্জে আলীর সঙ্গে বড়মিয়া নামের একজনের দেখা পায়। এই বড়মিয়ার সঙ্গে সখিনার বিয়ে হয় কিন্তু বিয়ের পর দেখা যায়, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হয় না, শাশুড়ি-ননদের যন্ত্রণায় একসময় বাপের বাড়ি এসে স্বামীর বাড়িতে আর ফিরে যেতে চায় না। সখিনা হোসেনকে পছন্দ করে, সে কথা মা-বাবার কাছে কখনো বলেতে পারে না। সখিনার চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্য থাকে না। নিয়তির কাছে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হয়। সখিনা স্বামী পরিত্যক্তা নারী বা ‘কাশবনের কন্যা’র উন্মূল প্রতীক হয়ে ওঠে। হোসেন পরে ছবদার মাঝির মেয়ে মেহেরজানের প্রেমে পড়ে। মেহেরজানকে হোসেন বলে যায়, বন্ধু কানু শিকদারের সঙ্গে পরামর্শ করে তার কাছে ফিরে আসবে কিন্তু মেহেরজানের কাছে হোসেনের আর ফেরা হয় না। হোসেন আর মেহেরজানের প্রেম অসমাপ্তই থেকে যায়। ভূমি আর নারী এখানে সমান্তরাল। কারণ সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ভূমির মালিকানা, সামাজিক সম্পর্ক ও ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানে ভূমিচ্যুত হয়ে গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া মানুষ ভূমির মালিকের ক্ষমতার কাছে বন্দি। মানুষের মানবিক অনুভূতির তুলনায় ভূমির প্রভাব অধিক কার্যকর হয়ে ওঠে। ভূমি মানুষের জীবনে নিয়তির মতো অবির্ভূত হয়ে ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। পঁচিশটি পরিচ্ছেদের মধ্যে সমান্তরাল দুটি প্রেম কাহিনি বর্ণিত হয়। আটটি পরিচ্ছেদে সখিনা, মেহেরজান, হোসেনের প্রেম, রোমান্টিক স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বর্ণিত হয়। সে সংসার-সন্তানের স্বপ্নে বিভোর থাকে। শিকদারের ভালোবাসার নারীর নাম জোবেদা। কিন্তু জোবেদার বিয়ে হয় দূরগ্রামের ভূস্বামী আসগরউল্লাহর সঙ্গে। সেখানে সে শাশুড়ি ও স্বামীর অত্যাচারে কষ্ট পায়। মহামারীতে পরিবারের সবাইকে হারিয়ে শিকদার একা, অন্যদিকে জমিজমাও হাতছাড়া হয়ে যায় ‘রাজা-রাজ্য বদলাইবার গণ্ডগোলে’। জোবেদাকে না পেয়ে শিকদার কবিয়াল জীবনেই মুক্তির পথ খুঁজে নেয়। মনসব সর্দারের বাড়িতে গান গাওয়ার সুবাদে শিকদারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। জোবেদাও একসময় স্বামী-সংসার ছেড়ে শিকদারের কাছে আশ্রয় নেয়। ‘দেশের মানুষ, তামাম দুনিয়ার মানুষ কয় আমার অভাবে, আমার জন্যই তোমার জীবন এমন শূন্য, এমন বিরান হইয়া গেছে। আইজ আমি আসছি। আমারে আর পায়ে ঠেলে দিও না। তুমি আবার আমারে নতুন করিয়া সাজাইতে দাও। ছোটকাল হইতে আমারে কত কন্যার কাহিনি শুনাইছ আর আমিও স্বপ্ন দেখছি এক পুরুষ,... তুমি সেই পুরুষ হও।... হায়রে পুরুষ!... ভাবিয়া আমি অবাক হইয়া যাই। কোন অধিকারে কন্যার স্বপ্ন দেখ তুমি, যদি অত্যাচারের মুখেও রুখিয়া খাড়াইতে না পারো? কী সেই গীতিকথার কাব্যমূল্য যদি আসল জীবনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক না থাকে? ঠিক আছে, তোমার কিছু করিতে হইবে না। শিকদার লক্ষ করিল, জোবেদা কোনো অজ্ঞাতের দিকে পা বাড়াইবার উপক্রম করিতেছে, শিকদার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। (পৃ.১৪৭-৪৮)’ জোবেদা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রেমিকের আশ্রয় নিলেও কানু শিকদার তাকে সামাজিক রীতি-নিয়মের কথা বলে। জোবেদাকে তার ভাইয়ের বাড়িতে যেতে বলে, তখন জোবেদা আত্মহত্যার কথা ভাবে। জোবেদাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তার ভাইয়ের বাড়িতে পাঠালে সেখানে তার স্বামী আসগরউল্লাহ উপস্থিত হয়। জোবেদাকে আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে যেতে হয়, তার বন্ধ্যত্বতার জন্য কবিরাজের চিকিৎসা নিতে বলে কিন্তু গ্রাম্য কবিরাজের চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, জোবেদা কানু শিকদারের বাড়িতে গোপনে আশ্রয় নেয়। ঘাট মাস্টার, মনসব সর্দার তাদের কাছে জোবেদার সঙ্গে কানু শিকদারের সম্পর্কের একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান চায়, জোবেদাকে নিয়ে কানু শিকদার ভাটি অঞ্চলে চলে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করে। মনসব সর্দার দেশপ্রধানের বাড়িতে গানের বিরাট আয়োজন করে সেখানে শিকদারকে গান গাইতে বলে কিন্তু তার গান তো পুরনো আমলের, এখানে মানুষ চায় মনজোগানো রঙচঙে গান। প্রেম-প্রণয়ের গান, দেশপ্রেমের গান, ভাববাদী গূঢ়রহস্যময় আধ্যাত্ম্য গান কেউ পছন্দ করে না। একসময় জোবেদা কাছে ছিল, নতুন বাঁধা হলেই প্রথম জোবেদাকে না শুনাইলে তার গান রচনার কোনো সার্থকতা বা আত্মতৃপ্তি হতো না। জোবেদার মুখের দিকে তাকাবার ফাঁকে সে কাশবনের দিকেও তাকাত। কানু শিকদারের মনে কাশবন, জোবেদার প্রতীক হয়ে ওঠে। বংশপরম্পরায় পাওয়া দোতারাটার যে নকশা আছে, তার মধ্যে ঐতিহ্যের ভিত্তি আছে। গানের আসরে জোবেদাকে মনসব সর্দারের উপস্থিত করার কথা কিন্তু জোবেদা শেষ পর্যন্ত আসে না। মনসব সর্দার ভাটি অঞ্চলে যাওয়ার সব আয়োজন করে, জোবেদা না এলেও কানু শিকদারসহ অন্যরা ভাটির দিকে যাত্রা করে। এই যাত্রা তাদের মুক্তি, নাকি নতুন করে বন্দি হওয়ার যাত্রা, সেটা অনিশ্চিত, অমীমাংসিতই থেকে যায়। বোঝা যায়, সামন্ততান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক কাঠামোর নিগড়ে বাধা ব্যক্তি-মানুষ, পুঁজিবাদী অর্থনীতি তখনো উপকূলবর্তী গ্রামীণ সমাজগুলোতে প্রবেশ করেনি। তবে সামান্তবাদী সমাজের শোষণ, অনড় হয়ে চেপে বসে আছে।
শামসুদ্দীন আবুল কালাম বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন বিএম কলেজে, সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশকে, পটুয়াখালীর তৎকালীন মুন্সেফ ম্যাজিস্ট্রেট অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে, পেয়েছেন দক্ষিণের বিল, চর কাশেম উপন্যাসের লেখক অমরেন্দ্রনাথ ঘোষকে। উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ শাহের বানু (১৯৪৫), অনেক দিনের আশা (১৯৫২)। তারপর একে একে পথ জানা নাই (১৯৫৩) প্রথম উপন্যাস কাশবনের কন্যা (১৯৫৪), আলমনগরের উপকথা (১৯৫৪), আশিয়ানা (১৯৫৫), কাঞ্চনমালা (১৯৬২), জায়জঙ্গল (১৯৮৭), মনের মতো ঠাঁই (১৯৮৫), সমুদ্র বাসর (১৯৮৬), যার সাথে যার (১৯৮৬), নবান্ন (১৯৮৬), কাঞ্চনগ্রাম (১৯৯৮) প্রভৃতি।
তার গল্প-উপন্যাসে জোয়ার-ভাটার জলসিক্ত পলিমাটি, জলমগ্ন জীবনের সংগ্রাম, দুরন্ত প্রকৃতি সর্বদা সজীব সোঁদা গন্ধে ভরপুর ছিল। কাশবনের কন্যা উপন্যাসই তাকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পরও তিনি কলকাতাতেই ছিলেন। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান সরকারের ঢাকা তথ্য দপ্তর, রেডিও পাকিস্তানের স্টাফ আর্টিস্ট, পরে সহপরিচালক হন। এখানেই বন্ধু হিসেবে পান কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, কবি ফররুখ আহমদ, কবি সৈয়দ আলী আহসানকে। থাকতেন আজিমপুর কলোনিতে, এখানে প্রতিবেশী হিসেবে পান শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কবি গোলাম মোস্তফা, আবু হেনা মোস্তাফা কামালকে। ১৯৫৬ সালে তিনি জাতিসংঘের শিক্ষাবিজ্ঞান ও সংস্কৃতি শাখা ইউনেস্কোর ফেলোশিপ নিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশ সফর করেন। ১৯৫৯ সালে ইতালির রোমে যান ফটোগ্রাফি, সেটডিজাইন, পাশ্চাত্য সংগীত নিয়ে পড়তে। ১৯৬১ সালে রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার চাকরি করতেন, ১৯৮৭ সালে চাকরি চলে যাওয়ার পর তিনি চরম অর্থ কষ্টে ভোগেন। সুযোগ থাকার পরও অন্য কোনো দেশে যাননি। নাগরিকত্ব ছাড়াই অনুমতি নিয়ে রোমেই থাকতেন। ১৯৯৭ সালে ১০ জানুয়ারি রোমের এক অ্যাপার্টমেন্টে নিভৃতেই শামসুদ্দীন আবুল কালামের জীবন অবসান হয়। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ক্রমবিচ্ছিন্নতা আর বিচ্ছেদই শামসুদ্দীন আবুল কালামকে এক শহর থেকে আরেক শহরে নিয়ে গেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন পরিচয় ঘটে হোসনে আরা বিজুর সঙ্গে। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে বাবা-মা, বড় দুলাভাই অধ্যাপক মকসুদ আলীর অমতে হোসনে আরা বিজুকেই বিয়ে করেন। থাকতেন হোসনে আরার এক ছোটভাইকে নিয়ে আজিমপুর কলোনিতে। সরকারি কাজে করাচিতে থাকাকালীন তার মা ফুলমেহের মারা যান। শামসুদ্দীন আবুল কালাম ঢাকায় ফিরে আসেন এবং তখন তিনি মায়ের শোকে কাতর। বাবা অসুস্থ, বরিশাল থেকে ছোট দুই বোনকে তিনি ঢাকায় নিয়ে আসেন। কিন্তু স্ত্রী হোসনে আরার সম্মতি না থাকায় বোনদের নিজ বাসায় রাখতে পারলেন না। এসব থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্কের চিড় ধরে। একপর্যায়ে হোসনে আরা শামসুদ্দীন আবুল কালামকে ছেড়ে অভিনেতা গোলাম মুস্তাফাকে বিয়ে করেন। সঙ্গে নিয়ে যান তার একমাত্র কন্যা ক্যামেলিয়াকে। যদিও এই বিচ্ছেদ এবং বিয়ে কখন কীভাবে হয়েছে, তার কোনো সঠিক সন-তারিখ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু বিচ্ছেদ-বিচ্ছিন্নতাকে মেনে নিয়েই শামসুদ্দীন আবুল কালাম হয়ে ওঠেন বিবাগী, পরবাসী, স্বেচ্ছায় নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন আমৃত্যু। মৃত্যুর সময় কোনো স্বজন-প্রিয়জনের মুখ দেখে চোখ বন্ধ করতে পারেননি, কোনো আত্মীয়ের উষ্ণ হাতের স্পর্শ ছিল না। এমনকি কবরটাও রোম শহরের ঠিক কোথায়, কেউ জানে না। বুকভরা অভিমান, আত্মগ্লানি তাকে জীবন-পলাতক করেছিল। কিন্তু রোমে আত্মীয়-স্বজনহীন নিঃসঙ্গ জীবন কাটালেও তার হৃদয় জুড়ে ছিল বাংলাদেশ, দক্ষিণ অঞ্চলের সাগর বিধৌত ভেজা পলিমাটি, জায়জঙ্গল, বিরূপ প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গে নিত্য লড়াই করে বেঁচে থাকা নর-নারীর জীবন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এই শিকড় সন্ধানী লেখকের এ বছর জন্মশতবর্ষ (জন্ম : ১৯২৬) অথচ কোথাও কোনো স্মরণ-উচ্চারণ ছাড়াই, তার মৃত্যুর মতোই খুব নীরবে, নিভৃতে কেটে যাচ্ছে।