শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা

শিশুরা ফুলের মতো পবিত্র। শিশুর নিষ্পাপ হাসি আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। তার কান্না আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে শিশুরা হত্যা, নির্যাতন, অবহেলা ও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অথচ প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলাম শিশুদের জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে।

শিশুর প্রতি নবীজির ভালোবাসা : শিশুদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর আচরণ ছিল অসাধারণ মমতাপূর্ণ। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) তার নাতি হাসান ইবন আলি (রা.)-কে চুমু দিচ্ছিলেন। সেখানে আকরা ইবনে হাবিস (রা.) উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমার দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই চুমু দিইনি। তখন নবীজি (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না। (সহিহ বুখারি)

এই ছোট্ট ঘটনাটিই শিশুদের যথাযথভাবে লালন-পালনের বড় একটি শিক্ষা দেয়। সন্তানকে শুধু খাওয়ানো, পরানো ও পড়াশোনা করানোই যথেষ্ট নয়, তার প্রয়োজন ভালোবাসা, স্নেহ ও মানসিক নিরাপত্তা। শিশুকে আদর করা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে নিরাপদ অনুভব করানোও ইসলামি শিক্ষার অংশ।

শিশুর কান্নার প্রতি নবীজির সংবেদনশীলতা: শিশুদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর মমতার আরেকটি অসাধারণ ঘটনা নামাজের সময়। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি অনেক সময় দীর্ঘ করে নামাজ আদায়ের ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াই। পরে শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষেপ করি। কারণ শিশুর মাকে কষ্টে ফেলা আমি পছন্দ করি না।’ (সহিহ বুখারি ৭০৭)

ভাবা যায়, যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল, যিনি নামাজে দীর্ঘ কেরাত পড়ার জন্য দাঁড়াতেন, তিনিই একটি শিশুর কান্না এবং মায়ের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি আমাদের শেখায়, শিশুর কান্নাকে বিরক্তির বিষয় হিসেবে না দেখে তার প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

শিশুর সঙ্গে কোমল আচরণ : নবীজি (সা.) শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন, তাদের সালাম দিতেন এবং তাদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করতেন। তার আচরণে শিশুরা ভয় নয়, বরং ভালোবাসা ও নিরাপত্তা অনুভব করত। এই নববী আদর্শ আজকের পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  অনেক সময় আমরা শিশুকে শাসনের নামে অতিরিক্ত বকাঝকা, অপমান কিংবা শারীরিক শাস্তি দিই। অথচ নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা হলো, শিশুর সঙ্গে রহমত ও কোমলতার আচরণ করতে হবে।

আজ যখন শিশুহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশুশ্রম কিংবা অবহেলার খবর আমাদের সামনে আসে, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে নবীজি (সা.)-এর সেই মমতাময় আদর্শের দিকে। যে নবী শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করেছেন, যে নবী শিশুকে চুমু দিয়ে বলেছেন ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না’, তার উম্মত হয়ে আমরা কীভাবে শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর হতে পারি? শিশুরা কারও বোঝা নয়। তারা আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাদের জীবন রক্ষা করা, ভালোবাসা দেওয়া, মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়