গত সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২১ হাজতি ও কয়েদির মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা অভিযোগ তুলে ‘মব’ সহিংসতার মাধ্যমে ৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন নদী, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৬৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গত মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৯ নারী ও কন্যাশিশু।
শনিবার (৩ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় এইচআরএসএস। ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতির এ চিত্র উঠে এসেছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সংস্থাটি বলেছে, সেপ্টেম্বরে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ২১ জন আসামি মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন কয়েদি ও ১০ জন হাজতি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের দুজন এবং ১৯ জন সাধারণ কয়েদি ও হাজতি ছিলেন।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একজন নির্যাতনে এবং দুজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পুলিশ দেখে দৌড়ে পালানোর সময় ড্রেনে পড়ে আহত হয়ে একজন মারা গেছেন।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন। তাদের মধ্যে ৪৭ জন, অর্থাৎ ৬০ শতাংশ, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর পাঁচ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরে ২৭১ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১৯৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে ধর্ষণের শিকার হয়েছে সাত ছেলে শিশু।
সেপ্টেম্বরে সারা দেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মাসে ৬৬টি ঘটনায় ৬৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ১১টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ২৪টি এবং শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ আটটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গলা কেটে হত্যা করা ছয়টি এবং হাত-পা বাঁধা নয়টি লাশ পাওয়া গেছে। এর বাইরে নানা ধরনের পরিস্থিতিতে আরও ১১টি লাশ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত মাসে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতার ৬৮টি ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিভিন্ন দলের ৫২৭ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। তবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহত কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের হাতে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১২টি ঘটনায় পাঁচজন আহত ও সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির পাঁচজন, জামায়াতের একজন ও একজন চরমপন্থী রয়েছেন।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক, যৌথ অভিযান ও বিশেষ অভিযানে ২৮৭টি ঘটনায় অন্তত ২১ হাজার ২০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৬৬৫ জন, বিএনপির ৬২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৩১ জন, এনসিপির একজন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ২৪ জন সদস্য রয়েছেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৩৫টি ঘটনায় নয়জন নিহত হয়েছেন।
গত সেপ্টেম্বরে সাংবাদিক নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ২০টি ঘটনায় কমপক্ষে ৩৫ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ১২টি ঘটনায় ১৪ জনকে আটক এবং ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে সমালোচনার কারণে ছয়জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে দুজন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মাদকসহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিনজনকে কুপিয়ে, পিটিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, একজনকে নির্যাতন এবং ছয়জনকে চাকরিচ্যুত বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন পাঁচজন।
সেপ্টেম্বরে শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই মাসে ৮৮টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও ১২১ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৬ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এক বিবৃতিতে মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি আরও সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।