সাশ্রয়ী আবাসন চাইলে কমাতে হবে নির্মাণ ব্যয়

রিয়েল অ্যাস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল। একই সঙ্গে তিনি কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান। আবাসন খাতের নানা দিক নিয়ে গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো

দেশ রূপান্তর : আবাসন সংকট নিরসনে বেসরকারি খাত বা উদ্যোক্তারা কী ভূমিকা রাখছে?

ড. আলী আফজাল : আবাসন সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের একার পক্ষে দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের আবাসনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি উদ্যোক্তারাই মূলত শহর ও শহরতলিতে বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট ও আবাসন প্রকল্প তৈরি করছেন। এর মাধ্যমে শুধু মানুষের থাকার ব্যবস্থা হচ্ছে না, একই সঙ্গে নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে ইট, বালু, সিমেন্ট, রড, টাইলস, আসবাবপত্রসহ প্রায় সব ধরনের সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।

তবে বর্তমানে উদ্যোক্তারাও নানা সংকটের মধ্যে কাজ করছেন। জমির উচ্চমূল্য, নির্মাণ ব্যয়, ঋণের সুদ, কর-ফি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী আবাসন তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব বিষয় সহজ করা গেলে বেসরকারি খাত আরও বেশি মানুষের জন্য আবাসন তৈরি করতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : আবাসন ব্যবসায় বর্তমানে কী কী সংকট রয়েছে?

ড. আলী আফজাল : বর্তমানে আবাসন ব্যবসা বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জমির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এর সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, ব্যাংকঋণের সুদহারও আগের তুলনায় অনেক বেশি। পাশাপাশি অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময়, বিভিন্ন ধরনের কর ও ফি, জটিল বিধিবিধান এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রকল্প শুরু করার পর নিয়ম পরিবর্তনের কারণে ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়ে যায়। অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে ক্রেতা যেমন ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না, তেমনি ডেভেলপাররাও কাক্সিক্ষত বিক্রি করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতি, সহজ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং যৌক্তিক কর কাঠামো প্রয়োজন।

দেশ রূপান্তর : ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার পেছনে কী কী কারণ কাজ করছে?

ড. আলী আফজাল : ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার পেছনে শুধু ডেভেলপারদের মুনাফাকে দায়ী করলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। একটি ফ্ল্যাটের দামের বড় অংশই আসে জমির মূল্য থেকে। বিশেষ করে ঢাকায় গত কয়েক বছরে জমির দাম অনেক বেড়েছে। এর পাশাপাশি রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, লিফট, বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, জমি রেজিস্ট্রেশন, কর, ভ্যাট এবং বিভিন্ন সরকারি ফি সব মিলিয়ে নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ডেভেলপাররা কম দামে ফ্ল্যাট দিতে চাইলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা যে হারে বাড়ছে, আবাসনের ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। তাই মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হলে শুধু ফ্ল্যাটের দাম কমানোর কথা বললেই হবে না; জমি, কর, নির্মাণ ব্যয় ও অর্থায়নের খরচও কমাতে হবে।

দেশ রূপান্তর : সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকার ও বেসরকারি খাতের কী করা প্রয়োজন?

ড. আলী আফজাল : আবাসন সংকট সমাধানে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রথমত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ আবাসন অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। একই সঙ্গে আবাসন খাতের ওপর কর ও ফি যৌক্তিক পর্যায়ে আনা দরকার।

দেশ রূপান্তর : রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে আবাসন পরিকল্পনায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?

ড. আলী আফজাল : ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত নতুন শহর ও আবাসিক এলাকা গড়ে তুললে রাজধানীর ওপর চাপও কমবে। সরকার চাইলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প নিতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

ড. আলী আফজাল : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নীতিতে স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। উদ্যোক্তারা যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পান, তাহলে তারা আরও বেশি আবাসন তৈরি করতে পারবেন। এতে ক্রেতারাও উপকৃত হবেন।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. আলী আফজাল : আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার মাধ্যমে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।