টাঙ্গাইলের বাসিন্দা রাশেদ আহমেদ। ঢাকার তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে থাকেন আগারগাঁওয়ে। যানজট, শব্দদূষণ, পরিবেশদূষণ-সহ নানা সংকটের মধ্যেও বাধ্য হয়ে ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকছেন তিনি। আলাপকালে তিনি জানান, ফ্ল্যাট কেনা তো দূরের কথা ভালো মানের বাসা ভাড়া নিতে গেলেও অনেক চিন্তা করতে হয়। একদিকে আয়ের সীমাবদ্ধতা অন্যদিকে সন্তানের বেড়ে ওঠার পরিবেশ দুই নিয়েই ভাবতে হচ্ছে তাকে। অথচ গ্রামে তার রয়েছে বিশাল বাড়ি।
নরসিংদীর শিবপুরের মনিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। চাকরি পাওয়ার পরই তাকে নতুন করে ভাবতে হয়েছে থাকার জায়গা নিয়ে। সরকারি কর্মজীবী নারী হোস্টেলে অনেক চেষ্টা করেও সিট পাননি। শেষ পর্যন্ত কর্মস্থলের সুবিধার জন্য মিরপুরে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি মেসে উঠেছেন।
মনিকা বলেন, চাকরি পাওয়ার পর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন পূরণ হলেও ঢাকায় থাকার জায়গা নিশ্চিত করা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ ও সুবিধাজনক জায়গায় থাকার সুযোগ না থাকায় প্রতিদিনই আবাসন নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে।
শুধু রাশেদ বা মনিকা নয়, এই শহরের প্রত্যেকটি মানুষই আবাসনের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন। একটু ভালো পরিবেশে থাকার জন্য মধ্যবিত্তের চেষ্টা যেন শেষ হয় না। অপরদিকে পরিবেশ যেমনই হোক এই শহরে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে বেড়ান হাজারো মানুষ। কেউবা ঘুমান সড়ক, ফুটপাত বা বস্তিতে, অনেকে অট্টলিকায়; আবার কেউ কেউ আলিশান ফ্ল্যাটে।
অথচ সবারই জানা এই শহরেই আছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি। সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট। দূষিত পানি ও বাতাস, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, পয়ঃবর্জ্যরে দুর্ভোগ। তার ওপর বাড়তি বাড়িভাড়া, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংকট। এতসব সমস্যার পরও নগর ছাড়ার সুযোগ নেই মানুষের। পেটের দায়ে, কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে, কিংবা সন্তানের পড়াশোনার তাগিদে নগরেই থাকতে হয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকায় ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও বর্জ্যপানি ঢাকার আন্তঃসংযুক্ত জলপথে গিয়ে পড়ে। এর ফলে টাকা খরচ করে বাড়িভাড়া নিতে পারলেও নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাচ্ছেন না ঢাকার বাসিন্দারা।
নগরে ভাড়ায় থাকা মানুষের বড় অংশেরই অন্য কোথাও নিজের বাড়ি আছে। কারও বাড়ি গ্রামে, কারও জেলা শহরে, কারও আবার নগরেরই অন্য প্রান্তে যেখানে আছে বসতভিটা, উঠান, পুকুর, গাছপালা ও কিছুটা নির্মল পরিবেশ। এত সুন্দর পরিবেশ রেখেও জঞ্জালের নগরে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে। কেউ কেউ একটি ফ্ল্যাট কিনতে জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ঢেলে দিচ্ছেন। লক্ষ্য একটাই একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই, একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ।
এর বাইরে গৃহহীন মানুষরাও নগরে ভিড় জমায় একটু ভালো আয়-রোজগারের আশায়, একটু ভালো সুবিধা পেতে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, খরা ও নদীভাঙনসহ নানা দুর্যোগে সহায়-সম্বলহীন মানুষও আশ্রয় নেন নগর এলাকায়। কোথাও আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আবার কোথাও ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। এর ফলে দিন দিন নগরগুলোর ওপর চাপ বেড়েই চলছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আবাসনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর সুফল সীমিত আয়ের মানুষ তেমন পায় না।
এই অবস্থায় প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘সর্বজনীন আবাসন, টেকসই নগরায়ণ’। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ নিয়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। গতকাল রবিবার এ উপলক্ষে শোভাযাত্রা করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
আজ সোমবার এ উপলক্ষে একটি সেমিনার হচ্ছে রাজধানীর চীন মৈত্রী আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। এরপর সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আবাসন মেলার উদ্বোধন করবেন তিনি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) মেলাটির আয়োজক। যেখানে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষসহ আবাসন সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। তাছাড়া সব বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে দিবসটি উদযাপন করা হবে।
বিশ্বজুড়ে নিরাপদ নগর এবং মানসম্মত বাসস্থান বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক বিশ্ব বসতি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।
ঢাকা-কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি আবাসনের চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৩’-এর তথ্য বলছে, সিটি করপোরেশন এলাকার ৬৭ দশমিক ৬১ শতাংশ পরিবার ভাড়া বাসায় থাকে। এর মধ্যে ৫৪ দশমিক ৬২ শতাংশ পরিবারের অন্য কোথাও নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। আর ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ পরিবারের কোথাও নিজস্ব বাড়ি নেই। অর্থাৎ নিজের বাড়ি থাকার পরও ৫৫ শতাংশ পরিবার শহরে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকছেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় নগর বসতির ওপর চাপ বাড়ার বড় কারণ মানুষের জীবিকা। কর্মস্থলের সুবিধার কারণেই মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন। এখানেও আবার সবাই আবাসনের পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। কারও ভাড়া বাসা বহুতল ভবনে, কারও ছোট ঘরে; আবার কারও ঠাঁই বস্তিতে।
বৃহত্তর দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বড় অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রায় অর্ধেক আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এ অঞ্চলে সৃষ্টি হয়। দেশের মোট জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশও বৃহত্তর ঢাকা থেকে আসে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশ বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলে। শুধু ঢাকা শহরেই রয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ চাকরি। যার ফলে ঢাকায় জনঘনত্ব বাড়ছে।
ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকার কোনো কোনো অংশে এক একর জমিতে এখন ৪০০ জনের বেশি মানুষ বাস করেন। অতিঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় ভবিষ্যতে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০০ জনে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৭৪ বর্গফুটে নগর বসতি
নগরের আবাসন সংকট শুধু ভাড়া দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শহরে মানুষ যে জায়গায় ভাড়া থাকে, সেটিও তুলনামূলক সংকুচিত। বিবিএস তথ্য বলছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় একটি শোবার ঘরের গড় আয়তন ৭৪ দশমিক ১ বর্গফুট। পৌরসভা ও অন্যান্য শহর এলাকায় এই আয়তন ৮২ বর্গফুট। আর গ্রামীণ এলাকায় ৮৭ দশমিক ৫ বর্গফুট। অর্থাৎ গ্রামের বাড়িতে তুলনামূলক বেশি জায়গা থাকার পরও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ নগরে এসে ছোট জায়গায় বসবাস করছে।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বসতি বলতে আমরা শুধু ঘরকে বোঝাচ্ছি না। এর সঙ্গে পরিবেশ, আলো, বাতাস ও চলাচলের রাস্তাও থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে যোগাযোগের সুবিধাসহ ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে উত্তরাসহ দুটি এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প হবে; পরে অন্যান্য এলাকায় বাস্তবায়ন করা হবে। মানুষ যেন এসব এলাকা থেকে ট্রেন, বাস বা অন্যান্য গণপরিবহনে দ্রুত ঢাকায় আসতে পারে এবং আবার সহজে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে পারে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আবাসন তৈরি করছে সরকারও দেশের আবাসন সংকট মোকাবিলায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং সরকারি আবাসন পরিদপ্তর আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং আবাসিক এলাকা উন্নয়নে কাজ করছে।
আলাপকালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব শ্রেণির মানুষের আবাসন নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। তুলনামূলক কম মূল্যে আবাসনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।
তিনি বলেন, ‘সেবা গ্রহীতাদের ভোগান্তি নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিজিটালাইজেশনসহ ভোগান্তি কমানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারের আবাসন সুবিধা যাতে সহজে মানুষ পায়, সে জন্য কাজ করছি।’
বিকেন্দ্রীকরণে কমতে পারে নগরের চাপ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ কমাতে প্রয়োজন কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণ। জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা বাড়ানো গেলে মানুষকে শুধু জীবিকার জন্য ঢাকায় ছুটতে হবে না। তখন নিজের গ্রামের বাড়ি বা জেলা শহরের বাড়িতে থেকেও কাজের সুযোগ পাওয়া সম্ভব হবে। মানুষের বসতি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দূরত্ব কমবে। কমবে দীর্ঘ যাতায়াতের চাপও। শুধু প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া নয়, অর্থনৈতিক কর্মকা- ছড়িয়ে দেওয়াই হতে হবে বিকেন্দ্রীকরণের মূল লক্ষ্য, যাতে মানুষের কাজের জন্য নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে ভাড়া থাকতে বাধ্য হওয়ার প্রয়োজন কমে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকাকেন্দ্রিক মাত্রাতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এই শহরের ওপর অনাবশ্যক চাপের মূল কারণ। একদিকে যেমন ঢাকার অভ্যন্তরীণ বৈষম্য দূর করতে প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় পার্ক, খেলার মাঠ, মানসম্মত স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো নাগরিক সুবিধা সমবণ্টন করতে হবে; অন্যদিকে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকার বাইরের আঞ্চলিক শহরগুলোকে নতুন ‘গ্রোথ সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়িত হলে ঢাকামুখী অতিরিক্ত মানুষের চাপ কমবে এবং সমগ্র দেশে একটি সুষম ও টেকসই স্থানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।