শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে চরাঞ্চলের শিক্ষা

একদিকে পদ্মার উত্তাল স্রোত, অন্যদিকে ভাঙা-গড়ার চরজীবন। কোথাও নৌকা, কোথাও কাঁচা সড়ক, আবার কোথাও নদী পেরিয়ে দুর্গম পথ। প্রতিদিন এসব পথ পাড়ি দিয়েই বিদ্যালয়ে যেতে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। পদ্মার গতিপথ বদলালে বদলে যায় ঘাট, সড়ক ও বসতির অবস্থান। কখনো নদীগর্ভে বিলীন হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ফলে ভাঙা-গড়ার এই জনপদে শিক্ষাব্যবস্থাও পড়েছে নানা সংকটে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পদ্মাবেষ্টিত আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ও সুতালড়ী ইউনিয়নে বর্তমানে এমন পরিস্থিতিই বিরাজ করছে। দুর্গম যোগাযোগ, শিক্ষক সংকট, বিদ্যালয়সংলগ্ন আবাসনের অভাব, নদীভাঙন, অনুন্নত সড়ক, দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতিতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিন ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে আশপাশে বসতি ও শিক্ষার্থী না থাকায় সুতালড়ী রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আটটিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ১৩টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ৫২টি পদের মধ্যে ২১টি পদ খালি। ফলে কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠ নিতে হচ্ছে, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। পাঠদান বন্ধ থাকা বিদ্যালয়ে পদায়ন আছে একজন সহকারী শিক্ষক। তিনি পাশের বিদ্যালয়ে মাঝেমধ্যে ক্লাস নেন বলে জানা গেছে।

শিক্ষকদের জন্যও এই চরাঞ্চলে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ। পদ্মা পেরিয়ে প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে হয় অনেক শিক্ষককে। কখনো ইঞ্জিনচালিত নৌযানে, কখনো দুর্গম সড়ক ধরে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে যেতে একদিকে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। নৌপথ ও সড়ক মিলিয়ে একদিকে সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা শুধু যাতায়াতেই চলে যায়। এর সঙ্গে রয়েছে কয়েকশ টাকা পর্যন্ত দৈনিক খরচ।

পাঠানকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ‘প্রতিদিন যাতায়াতেই আমার প্রায় ৩ ঘণ্টা চলে যায়। প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা। বেতনের বড় একটি অংশ যাতায়াতেই চলে যায়। আজিমনগর, হারুকান্দি ও লেছড়াগঞ্জ চরে যারা শিক্ষকতা করেন, তাদের যাতায়াতব্যবস্থা আরও কঠিন। বর্ষার সময় পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়। অনেক কষ্ট করে বাধ্য হয়ে আমাদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়।’

এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলী বলেন, ‘যাতায়াতে প্রতিদিন প্রায় ২ ঘণ্টা সময় চলে যায়। খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা। বর্ষায় সময় ও খরচ দুটোই আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এ জন্য আমাদের কোনো ভাতা নেই।’

যাতায়াতের পাশাপাশি রয়েছে আবাসন সংকট। বিদ্যালয়ের আশপাশে ভাড়া বাসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেক শিক্ষককে দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যায়। তখন নৌযানই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। নদী উত্তাল থাকলে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। আবার ভাঙনে ঘাট ও চলাচলের পথ বদলে গেলে আগের যাতায়াতব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে যায়।

নদীভাঙনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও। সুতালড়ী রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তার অন্যতম উদাহরণ। ২০২১ সালে বিদ্যালয়টির ভবন নদীভাঙনের মুখে পড়ে। এর আগেও ভাঙনের কারণে বিদ্যালয়টি একাধিকবার স্থানান্তরিত হয়েছিল। ওই সময় বিদ্যালয়টি রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন।

তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৬ দশমিক ০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই তিন ইউনিয়নে বসবাস করেন প্রায় ১৯ হাজার ৫৬২ মানুষ। সম্মিলিত সাক্ষরতার হার প্রায় ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে পদ্মার গতিপথ পরিবর্তন ও নদীভাঙনে বারবার বদলে যাচ্ছে এই ভূখ-ের চেহারা। একদিকে পুরনো বসতি ও কৃষিজমি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জেগে উঠছে নতুন চর। সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের বসতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জীবনযাত্রা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষাব্যবস্থায়।

এই তিন ইউনিয়নের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। নদীভাঙনে কৃষিজমি ও বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জীবনও হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। প্রতি বছর বর্ষায় আবাদি জমির একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। জীবিকা টিকিয়ে রাখতে অনেক পরিবারকে স্থান বদল করতে হচ্ছে। এতে শিশুদের পড়াশোনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শুধু শিক্ষক সংকট কিংবা বিদ্যালয় স্থানান্তর নয়, নিয়মিত উপস্থিতির সংকটও রয়েছে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোয়। কাগজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকলেও বাস্তবে অনেক বিদ্যালয়ে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কোনো বিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও কোনো কোনো দিন ১৫ থেকে ২০ জনের মতো উপস্থিত থাকে। ফলে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক শিশু নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চরাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়েছে দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্কও। অনেক এলাকায় ঠিকমতো মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পারস্পরিক যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে না পারলে কিংবা কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে দ্রুত যোগাযোগ করাও সম্ভব হয় না।

সচেতন সমাজের প্রতিনিধি ও লেখক মুহা. কুদ্দুসুর রহমান মনে করেন, চরাঞ্চলের এই সংকট শুধু নতুন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। শিক্ষক পদ পূরণের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ যাতায়াত সুবিধা বা ভাতা, বিদ্যালয়সংলগ্ন নিরাপদ আবাসন, নদীভাঙন থেকে বিদ্যালয় রক্ষা, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচি প্রয়োজন।

হরিরামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা দরকার। এ বিষয়ে পরিকল্পনার প্রস্তাবনা প্রায় ছয় মাস আগে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোয় পদায়নের ক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দিলে অনেকটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে চরাঞ্চলের শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছি।’