মানসম্মত আবাসনের পথে বাংলাদেশ

প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম

উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ডেপুটি সিইও) রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড

আবাসন মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা এবং টেকসই নগরায়ণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রীভবনের ফলে বাংলাদেশে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নিরাপদ, মানসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ।

সাশ্রয়ী আবাসন, মানের সঙ্গে আপস নয়

জমির মূল্য, নির্মাণসামগ্রী, অর্থায়ন ও উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদি ও সহজলভ্য আবাসন অর্থায়ন, গ্রাহকবান্ধব কিস্তি এবং দক্ষ প্রকল্প পরিকল্পনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সাশ্রয়ী আবাসন মানেই নিম্নমানের আবাসন নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ নকশা, বৃহৎ পরিসরে নির্মাণ এবং কার্যকর প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গুণগত মান বজায় রেখেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

নির্মাণ ব্যয় ও দক্ষ জনবল

ইস্পাত, সিমেন্ট, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক ও স্যানিটারি সামগ্রীসহ নির্মাণ উপকরণের মূল্য ও সরবরাহ সরাসরি প্রকল্প ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। তাই স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা, যৌক্তিক আমদানি নীতি, দ্রুত শুল্কায়ন এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি, কারিগরি পেশাজীবী ও প্রশিক্ষিত নির্মাণকর্মী তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দক্ষ জনবল হলো নির্মাণের মান, নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি।

ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত নগরায়ণ

শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত নতুন নগরকেন্দ্র ও উপশহর গড়ে তুলতে হবে যেখানে আবাসনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধা থাকবে। মানুষকে শুধু কাজের জন্য ঢাকায় বসবাস করতে হবে এমন বাস্তবতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বহুকেন্দ্রিক ও বিকেন্দ্রীভূত নগরায়ণ হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন কৌশল।

দায়িত্বশীল বেসরকারি খাত

দেশের আবাসন চাহিদা পূরণে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অপরিহার্য। একজন দায়িত্বশীল আবাসন উন্নয়নকারী শুধু ভবন নির্মাণ করেন না; পরিকল্পনা, স্থাপত্য, প্রকৌশল, অবকাঠামো, মাননিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকসেবা এবং কমিউনিটি উন্নয়ন সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেন। সরকারের নীতি ও অবকাঠামোগত সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে গুণগত মান, স্বচ্ছতা, সাশ্রয়ী মূল্য, নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

রূপায়ণের অঙ্গীকার

বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আবাসন উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড বিভিন্ন শ্রেণি ও আয়ের মানুষের জন্য আবাসন উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে আধুনিক বাণিজ্যিক পরিসর তৈরিতেও কাজ করছে।

আমাদের লক্ষ্য উন্নত নির্মাণমান, আধুনিক স্থাপত্য, দক্ষ প্রকৌশল ও নির্মাণ দল, পেশাদার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টেকসই ও গ্রাহককেন্দ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতের উন্নয়নে নিরাপত্তা, বিধিবিধান পরিপালন, জ্বালানি দক্ষতা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণনীতিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো

আবাসন খাতের বিকাশের জন্য প্রয়োজন একটি পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ, দক্ষ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত পরিবেশ। দীর্ঘমেয়াদি আবাসন অর্থায়ন, সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য নীতিগত সহায়তা, উন্নত অবকাঠামো এবং ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত নগরায়ণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আমাদের নীতিগত দর্শন হতে পারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সহজ প্রক্রিয়া। দ্রুত অনুমোদন, কঠোর বিধি-পরিপালন। উন্নয়নবান্ধব নীতি, কিন্তু নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়। ডিজিটাল অনুমোদন, সমন্বিত ছাড়পত্র এবং একক-জানালা সেবা চালু হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় কমবে এবং এর সুফল সরাসরি গ্রাহক ও অর্থনীতিতে পৌঁছবে।

আগামীর আবাসন : শুধু ভবন নয়, বাসযোগ্য নগর

বাংলাদেশের নগরায়ণকে এখন ঢাকাকেন্দ্রিক মডেল থেকে বহুনগরভিত্তিক, মিশ্র-ব্যবহারভিত্তিক ও বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, টেকসই উন্নয়ন এবং উন্নত গ্রাহকসেবা হবে ভবিষ্যতের আবাসন খাতের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

তাই আবাসন উন্নয়নকারীর ভূমিকা শুধু ‘সম্পত্তি বিক্রেতা’ হিসেবে নয়; বরং নগর উন্নয়নকারী, কমিউনিটি নির্মাতা এবং দায়িত্বশীল নগর-উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বিশ্ব আবাসন দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে এমন একটি আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে নিরাপদ, মানসম্মত, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত হবে।

‘আবাসন শুধু একটি ফ্ল্যাট নয়; এটি একটি পরিবারের নিরাপত্তা, একটি মানুষের ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং একটি দেশের পরিকল্পিত নগরায়ণের ভিত্তি।’