বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রধানমন্ত্রী

শিক্ষকতা হবে মেধাবীদের প্রথম পছন্দ

মেধাবীরা কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে যেন প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয় সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষকতা কোনোভাবেই “উপায়হীন বিকল্প” বা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হতে পারে না। পেশাগত জীবনে শিক্ষায়-দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবীরা যাতে শিক্ষকতাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যে সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে; শিক্ষক নিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার বিশ্বাস করে, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।’ গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য : ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো : পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’। এ উপলক্ষে বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিয়েছে সরকার। শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রত্যেক গুণী শিক্ষককে দুই লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ জন, কলেজ পর্যায়ে ২৫ জন, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ২০ জন, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিন জন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিন জন এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চার জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত সাতজন শিক্ষককেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের “প্রয়োজন ও প্রিয়জন” হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে সুনাগরিক তৈরিতে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজতর হবে। পারিবারিক পাঠশালার গন্ডি পেরোনোর পর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই “আদর্শ রোল মডেল”। শিক্ষকরা যাতে শিক্ষার্থীদের রোল মডেল হয়ে উঠতে পারেন, সে জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে সরকার।’

তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এ সময়ে প্রচলিত শিক্ষা-পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষাগ্রহণের বিকল্প নেই। শিখন ও শিক্ষণ-পদ্ধতির পরিবর্তন এবং সিলেবাসের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই পাবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যাতে বইবিমুখ হয়ে না ওঠে সেজন্য শিখন ও শিক্ষণ পদ্ধতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুখস্থবিদ্যা নয়, “কেন” ও “কীভাবে” এ প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে। আগ্রহ তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে। “আনন্দময় শিক্ষা” এখন সারা বিশ্বে, বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” শিরোনামে নতুন একটি বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের বই দেওয়া হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন শিক্ষাব্যবস্থার সামনে যেমন বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় বড় চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞানার্জনের সুযোগকে অবারিত করেছে। সার্টিফিকেট-নির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামনেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজের আরও আধুনিকায়ন জরুরি। প্রযুক্তিকে আমরা শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে দেখতে চাই না, বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি। এ লক্ষ্যেই সরকার “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে।’

তিনি জানান, এ কর্মসূচির আওতায় একজন শিক্ষক ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে কেউ ঝরে পড়লেও যেন বেকার না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষা খাত সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাজেট আরও বাড়ানো হবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন। এ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশই বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষায় শহর ও গ্রামের কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে সব এলাকার শিক্ষার্থী যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।’

শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর মূল ভিত্তি হচ্ছে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিবসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে রাষ্ট্রীয় ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। চলতি বছর থেকে একটি নীতিমালার ভিত্তিতে এসব অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটা বাধ্যতামূলক। শিক্ষক কর্মরতই থাকুন বা অবসর জীবনেই থাকুন আমৃত্যু তিনি রাষ্ট্রের কাছে সম্মানীয়।’ শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।

নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার : সকালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘নাগরিকদের জন্য শুধু একটি ঘর নয় বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও মৌলিক সেবা-সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থান নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।’ তিনি বলেন, ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ নিশ্চিত করতে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে।’

বাংলাদেশের শহর, বন্দর ও নগরে প্রতিনিয়ত মানুষের বসতি ও বসবাস বাড়ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘রাজধানী ঢাকা বর্তমানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে রয়েছে। দেশের অন্যান্য শহরেও প্রায় একই পরিস্থিতি। স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় শহরাঞ্চলে কয়েক গুণ বেশি মানুষের বসবাসের কারণে নগরজীবনে নানা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরে সব মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিশ্চিত করা এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান সুবিধা প্রদান বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। এ লক্ষ্য পূরণে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।’ শহরাঞ্চলে মানুষের চাপ কমাতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্ব বসতি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। ‘বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬’ উদযাপন উপলক্ষে একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের আগে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ গাছের চারা রোপণ করেন।

বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের লবিতে তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের সভাপতিত্বে আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একই মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিস ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেচনিয়াক।