বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

দুর্বল প্রবৃদ্ধিতে বাড়ছে দারিদ্র্য ও ব্যাংক খাতে ঝুঁকি

জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দাভাব এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি মনে করে, দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে দেশে দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে পারে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ থেকে উত্তরণে ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এগুলো ঠিক থাকলে প্রবৃদ্ধি হতে পারে। যা ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রোটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরীন আহমেদ মাহবুব, বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসম, জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা এবং নাজমুস সাদাত খান বক্তব্য রাখেন।

বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহের সংকট ধীরে ধীরে কমলে এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে গতি এলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ কার্যক্রমে শ্লথগতি এসেছে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতিও কমেছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা সরকারি বিনিয়োগকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আরও বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য দেশকে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।

বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে গেছে এবং নারীরা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব আহরণেও বাংলাদেশের দুর্বলতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আহরণ করে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন রাজস্ব আহরণকারী দেশগুলোর একটি। এর ফলে প্রয়োজনীয় খাতে সরকারি ব্যয় সীমিত হয়ে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির মতে, এসব কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও কার্যকর করা গেলে দারিদ্র্য কমানোর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। সীমিত সরকারি সম্পদ যাতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছায়, সে জন্য আরও সাড়া দিতে সক্ষম সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তথ্যভিত্তিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং নিয়মিতভাবে নতুন উপকারভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে এ ব্যবস্থা। এতে উপকারভোগী নির্বাচন ও কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা, বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন আরও কার্যকর করা এবং ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।

অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ নানা চাপের মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। শক্তিশালী প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতির কারণে এ খাতে স্থিতিশীলতা এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেমিনারে ‘দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক হালনাগাদ’ প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক অভিঘাতের মধ্যেও অঞ্চলটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিকূলতা বাড়তে থাকায় ২০২৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কৌশলগত ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এ অঞ্চল এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজতে ক্রমবর্ধমান হারে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

সরকারগুলোও জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম উন্নত করতে এআই ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ভারতের ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বাংলাদেশে চোখের রেটিনা পরীক্ষার মতো সেবা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রাঞ্জিস্কা ওহনসর্গে (ঋৎধহুরংশধ ঙযহংড়ৎমব) বলেন, এআই গ্রহণের ফলে শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জনসেবা প্রদান উন্নত করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের গতিপথে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সুফল পেতে হলে সরকারগুলোকে এআই ব্যবহারের পথে থাকা মৌলিক ঘাটতিগুলো মোকাবিলা করতে হবে।