বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক

উচ্চ প্রবৃদ্ধির আগে স্থিতিশীল অর্থনীতিতে জোর অর্থনীতিবিদদের

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতায় হঠাৎ করে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার পরিবর্তে অর্থনীতির বিদ্যমান নিম্নস্তরের ভারসাম্যকে আগে স্থিতিশীল করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। গত ৫ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের এক আলোচনায় এসব পরামর্শ উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আলোচনায় ব্যাংক খাতের পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা, বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রতিরোধ এবং অর্থনীতিতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।

অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে কাজ করা যেতে পারে। ব্যাংকগুলোর মৌলিক পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজন আছে কি না, থাকলে কী পরিমাণ প্রয়োজন, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা শুরু হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রেও এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিবছর আরও বেশি কর্মী বিদেশে পাঠাতে চায়। কিন্তু গন্তব্য দেশগুলোর ভেতর থেকেই এর বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি শুধু জনশক্তি রপ্তানি নয়, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই এ বিষয়ে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

বৈঠকে উপস্থিত অর্থনীতিবিদরা বলেন, অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব অর্থ যদি যথাযথভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হয়, তাহলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। বরং ঋণের অর্থ ভোগের কাজে ব্যবহার হলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

আলোচনায় বলা হয়, বর্তমানে অর্থনীতিতে একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় হঠাৎ করে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা না করে প্রথমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। কারণ উচ্চ প্রবৃদ্ধির চাপ অর্থনীতি ও সমাজ কতটা গ্রহণ করতে পারবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। টেকসই ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশ এখন প্রায় অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ। কিন্তু দেশের কর্মকা- ও আচরণে সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী, দুপক্ষেরই আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। আস্থা ফিরলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভোগ, সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বৈঠকে ব্যাংক খাতের সুশাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। অর্থনীতিবিদরা বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই অবস্থানে অটল থাকতে হবে।

তারা বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের পরিবর্তে পরিচালকদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বৈঠকে বেসরকারি খাতের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

বৈঠকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেসরকারি খাত অনেকটা উপেক্ষিত হয়েছে। কিন্তু দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে বেসরকারি খাতের বিকল্প নেই। তাই এই খাতকে উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তাদের মতে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারী ও আর্থিক ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠন করতে হবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। আলোচনায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তাদের মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব, মূলধনের দুর্বলতা এবং ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারার মতো সমস্যাগুলো একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাংক খাতের স্থায়ী সংস্কার সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীরা যদি বিনিয়োগে আস্থা না পান এবং ভোক্তারা যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করা যাবে না। এজন্য নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যাংক খাতে সুশাসন এবং বেসরকারি খাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত