রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হককে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ পরিচয়ে একদল ব্যক্তি এ ঘটনা ঘটায়। তারা উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে মারপিট করে তার কাছ থেকে চাকরির ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর আদায় করে নেন। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে যেতে পারছেন না উপাচার্য। বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছেন। এদিকে এ ঘটনায় কারা জড়িত এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি উপাচার্য। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের একটি অংশ ভিসি ডা. জাওয়াদুলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে। গতকালের বিক্ষোভেও বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের একাধিক নেতার উপস্থিতি দেখা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হেনস্তার শিকার কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ ব্যানার নিয়ে একদল ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। পরে তারা উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হকের কক্ষে গিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ অ্যাখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ স্থানীয়দের না দিয়ে ঢাকার ঠিকাদারদের দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করে। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের লিখে আনা একটি পদত্যাগপত্রে উপাচার্যকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এরপরই তারা সেকশন অফিসার নাজমুলকে মারধর করে চাকরির ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর নেয়। একপর্যায়ে তারা উপাচার্যকে বের করে দিয়ে কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এর আগে উপাচার্যের কক্ষ থেকে কম্পিউটারের সিপিইউ এবং সিসিটিভি ফুটেজের যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে অফিসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
এ ঘটনায় বিকেলে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রেস্ট হাউজে সংবাদ সম্মেলন করেন উপাচার্য ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক। তিনি বলেন, ‘মিটিং চলাকালে বাইরে হট্টগোলের শব্দ শুনতে পাই। পরে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল পিয়নদের ধাক্কা দিয়ে দপ্তরে প্রবেশ করে। তারা বলে, আপনি আওয়ামী লীগের দোসর। রাজশাহীর মানুষকে কাজ দেন না, ঢাকার মানুষদের দেন। এই চেয়ারে থাকতে পারবেন না। এ সময় তারা আমাকে চেয়ার থেকে উঠে আসতে বলে এবং পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। পদত্যাগপত্রটি তারা আগেই টাইপ করে নিয়ে এসেছিল। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, স্বাক্ষর না করলে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল। সেই পরিস্থিতিতে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করি। এরপর আমাকে দপ্তর থেকে বের করে দেয়। মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং গালাগাল করতে থাকে। এ ছাড়া আমার কম্পিউটারে থাকা শিডিউল ও বিভিন্ন তথ্য মুছে দেয়। একই সঙ্গে ওয়াই-ফাই, ইন্টারনেট সংযোগ এবং সিসিটিভির ফুটেজও নষ্ট করে দেয়।’
কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে জানতে চাইলে ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘তাদের আমি সেভাবে চিনি না। এর আগেও তারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন ছিল কি না, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।’
কার্যালয়ের সেকশন অফিসার ও ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন জানান, ‘সকাল ১০টা থেকে উপাচার্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি অনলাইন বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। একদল লোক মিছিল নিয়ে জোর করে কক্ষে প্রবেশ করে উপাচার্যকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং পূর্বপ্রস্তুতকৃত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়। এরপর আমাকেও ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। আমি এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমাকে মারধর করে।’
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের রাজপাড়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ফোনে খবর পেলাম একদল লোক রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেছে। গিয়ে দেখি ভিসির রুম তালাবদ্ধ। এ সময় অন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে কেউ এখনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।
রাজশাহী সদর আসনের এমপি ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, এ কাজ যারাই করুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।