তথ্য পাচারকারী পুলিশের দিকে ‘বিশেষ চোখ’

কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য বাহিনীর গোপন তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন বলে ‘অভিযোগ’ উঠেছে। কিছুদিন আগে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসির কথোপকথনের অডিওবার্তা নিয়ে সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। ওই ওসিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ঘটনার পর তথ্য পাচারকারী পুলিশের দিকে ‘বিশেষ চোখ’ রেখেছে পুলিশ সদর দপ্তর। একাধিক সদস্যের আমলনামাও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টরদের তথ্য যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি রাজারবাগে পুলিশের একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘পুলিশে চাকরি করে কোনো ধরনের অপরাধ করা যাবে না। কেউ কেউ ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।’

পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তথ্য পাচার সন্দেহে একাধিক সদস্যের আমলনামা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টরদের তথ্য যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। বাহিনীর ভেতরে তথ্য পাচার, দায়িত্বে অনিয়ম, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও নানা ধরনের অপকর্মের অভিযোগ ঘিরে সদস্যদের ওপর নজরদারি বাড়ছে। বিশেষ করে, সংবেদনশীল দায়িত্বে থাকা বা অতীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা সদস্যদের কর্মকাণ্ড নতুন করে খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি কোনো সদস্যের রাজনৈতিক যোগাযোগ বা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কও যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সময় কর্মকর্তা ও ফোর্সের নানান ধরনের তথ্য প্রয়োজন হয়। পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের জন্য ফ্রেশ কর্মকর্তাদের তালিকা নবায়ন করা হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের বাছাই করা হয়। এটা পুলিশের নিয়মিত কর্মকান্ডেরই অংশ।

তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে ব্যক্তির নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড ও অভিযোগের প্রমাণ যাচাই করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। সম্প্রতি সরকারি ও নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে বিক্রির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশের ভেতরে কেউ তথ্য বাইরে পাঠাচ্ছেন কি না, কোনো অপরাধী চক্র বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কি না এসব প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া বেশি পুলিশ সদস্যের নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাইও শেষ করে আনা হয়েছে। পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক বা জব্দ করা আলামত নিয়ে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও আছে। চলতি বছরের মে মাসে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসির একটি ভাইরাল অডিওকে কেন্দ্র করে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তা অডিওটি তার নয় বলে দাবি করলেও কাজ হয়নি।

এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তগুলো বাহিনীতে কর্মরত নেই এমন সদস্য অথবা কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের কাছে পাচার করা দেশদ্রোহী কাজ। অপরাধ দমনে একটি বাহিনী কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, সেটা ফাঁস করে দেওয়া পেশাদারিত্বের লঙ্ঘন। পুলিশের চাকরিবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। যারা এসব অপরাধে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দ্রুত সময়ে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ফলে বাহিনীর কেউ এমন কাজে জড়িত থাকলে সতর্ক হয়ে যাবে।

এসপি-ওসি বাছাইয়ে ‘ফিটলিস্ট’ : পুলিশের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব নিয়েও নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসপি থেকে তদূর্ধ্ব এবং পরিদর্শক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়নে ‘ফিটলিস্ট’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৎ, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বাছাইয়ের জন্য ২০০ নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়নের প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছে এবং দুটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পদায়ন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। নতুন নীতিমালার আওতায় এক মাসে ৪৩৩ পুলিশ সদস্যকে নিজ জেলা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

আস্থার সংকট কাটানোই বড় চ্যালেঞ্জ : বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সদস্যদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং একটি পেশাদার, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কাঠামো তৈরি করা। বদলি, পদোন্নতি ও অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে অতীতে অনিয়ম বা অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। অন্যদিকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মীয়তা বা কোন সময়ে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন এসবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বাহিনীর ভেতরে অনাস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তথ্য পাচারের অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

নানা বিষয়ে হচ্ছে বিশদ তথ্য : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের ভেতরে তথ্য পাচার, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা দায়িত্বে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে নির্দোষ সদস্যদের অযথা হয়রানি না করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হচ্ছে। সদস্যের অতীত রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অভিযোগ, গোয়েন্দা তথ্য, বিভাগীয় নথি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নজরদারিতে থাকা পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদানকারী এনক্রিপ্টেড অ্যাপ (যেমন : হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রাম) ব্যবহার করে বাইরের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, পলাতক অপরাধী কিংবা নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের কাছে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ খবরাখবর পৌঁছে দিচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তথ্য পাচারকারীদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) এবং গোপন যোগাযোগের ট্র্যাকিং শুরু হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থাই নয়, বরং রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা দণ্ডবিধির আওতায় আনা হবে।

নজরদারিতে স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বলয় : অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ওপর সরাসরি নজরদারি চালানোর পাশাপাশি এখন তাদের স্বজনদের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত বা বিতর্কিত কর্মকর্তা নিজে সামনে না থেকে স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন বা নিকটাত্মীয়দের নামে অবৈধ সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। কর্মকর্তা বা অন্য সদস্যদের স্বজনরা সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক বা বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছেন তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : সম্প্রতি কিছু পুলিশ সদস্যের আচরণে পুরো বাহিনী ইমেজ সংকটের মধ্যে পড়েছে। গাজীপুরে তালিকাভুক্ত এক আসামিকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করায় পুলিশের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে অনেকেই বেপরোয়া আচরণ করেন। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আমলনামার তথ্য চেয়ে চিঠি : প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এসব তথ্য চাওয়া হলেও একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক পরিদর্শকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কারণ নিয়ে বাহিনীর ভেতরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশের ধারণা, বদলি-পদায়ন, দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন কিংবা প্রশাসনিক যাচাইয়ের কাজে এসব তথ্য ব্যবহার করা হতে পারে। সারা দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত পরিদর্শকদের একটি নির্দিষ্ট গুগল ফর্মের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর পুলিশ পরিদর্শকদের ওই ফরমে সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, পুলিশে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শকদের ‘প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি হালনাগাদ করার লক্ষ্যে’ তাদের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

কেন হঠাৎ ব্যক্তিগত তথ্য : একজন পুলিশ কর্মকর্তার চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সংরক্ষিত থাকে। পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, ছুটি, অবসরসহ প্রশাসনিক নানা কাজে কর্মকর্তাদের সার্ভিস রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে প্রচলিত সার্ভিস রেকর্ডে থাকা তথ্যের বাইরে নতুন করে কোন তথ্যের প্রয়োজন হলো? বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তার বর্তমান কর্মস্থল, আগের কর্মস্থল, চাকরির মেয়াদ, পদায়নের ইতিহাস, নিজ জেলা, স্থায়ী ঠিকানা, পারিবারিক তথ্য, যোগাযোগের তথ্য কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য যদি একসঙ্গে চাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এসব তথ্যের ব্যবহার ও সংরক্ষণ পদ্ধতি কী হবে এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

আগে থেকেই আছে তথ্যভান্ডার : পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, অফিশিয়াল ই-মেইল, অফিস ফোন ও মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাহিনীর কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে। এছাড়া অতীতে পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্যভান্ডার (পার্সোনাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-পিআইএমএস) নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পিআইএমএস-এ কর্মকর্তাদের বাসাবাড়ির ঠিকানা ও ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত ছিল এবং ওই তথ্যভান্ডার নিয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা ও ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অতীতের ভূমিকা কী বিবেচনায় আসছে : সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতীত দায়িত্ব, পদায়ন ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা পুরো একটি শ্রেণির কর্মকর্তাকে অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে কি না এ নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই।