সন্দেহের চোখ

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জনবান্ধব পুলিশ চাই

পুলিশ রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যা দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মুখ্য দায়িত্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশকে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, হচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত রাজনৈতিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার যন্ত্র হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর ফলে সংস্থাটির ঐতিহ্য-গৌরব অনেকটাই মøান হয়ে পড়ার অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া দুরূহ। তবে এও অসত্য নয়, অতীতে প্রায় প্রতিটি সরকারের শাসনামলেই সরকারের ‘ইচ্ছা পূরণে’ পুলিশকে কমবেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে পুলিশের পেশাদারত্বে-দায়বদ্ধতায়-নৈতিকতা ক্ষয়ের স্রোতে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে চুকে যায় জবাবদিহির পাঠ।

৭ অক্টোবর তথ্য পাচারকারী পুলিশের দিকে ‘বিশেষ চোখ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে আশা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এ থেকেই সৃষ্ট, তা বলা অমূলক হবে বলে আমরা মনে করি না। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য বাহিনীর গোপন তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন বলে ‘অভিযোগ’ উঠেছে। নিকট অতীতে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসির কথোপকথনের অডিওবার্তা নতুন করে পুলিশকে নেতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাটির পর তথ্য পাচারকারী পুলিশের দিকে ‘বিশেষ চোখ’ রেখেছে পুলিশ সদর দপ্তর। একাধিক সদস্যের আমলনামাও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টরদের তথ্য যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও রাজারবাগে পুলিশের একটি অনুষ্ঠানে এ ব্যাপারে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বাপর পুলিশ বাহিনীতে যে অভিঘাত লাগে, এর প্রভাব কাটিয়ে পুলিশ এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিজেদের নিয়ে যেতে পারেনি। আমরা বিশ^াস করি, পুলিশ বাহিনীতে নীতিনিষ্ঠ-কর্মদক্ষ-জনবান্ধব অনেক কর্মকর্তা ও সদস্য আছেন। কিন্তু দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে প্রশ্নবিদ্ধ পুলিশের সংখ্যা কত-সমান্তরালে এ প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের যেকোনো তথ্যের যথাযথ প্রতিপালন-সংরক্ষণ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার কর্তব্য। রাষ্ট্রের অতি সংবেদনশীল কিছু ক্ষেত্র আছে, যার মধ্যে পুলিশ অন্যতম। যাদের প্রধান কর্তব্য ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ তাদের ভূমিকা যদি হয় জনবৈরী, তাহলে এর ক্ষতি কতটা বহুমাত্রিক হতে পারে এর নজির আমাদের সামনে আছে। অনিয়ম-দুর্নীতি-কদাচর-দুরাচারে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যের সম্পৃক্ততা শুধু বিস্ময়ের জন্মই দেইনি, জনমনে প্রশ্ন যুগপৎ ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে। পোশাকধারী কোনো বাহিনী কিংবা সংস্থার কোনো সদস্য যদি কোনো দুষ্কর্ম করেন তাহলে এর দায়টা বর্তায় গোটা বাহিনীর ওপর, তা বিস্মৃত না হলেই মঙ্গল। আমরা স্বচ্ছ-গতিশীল-দক্ষ-দায়বদ্ধ-জবাবদিহিমূলক পুলিশ চাই, কিন্তু পুলিশি রাষ্ট্র চাই না। আমরা জানি, সাধারণত কর্র্তৃত্ববাদী, একচ্ছত্রবাদী বা অনুদারপন্থী শাসনব্যবস্থায় অর্থাৎ যা একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীতে তাতে পুলিশি রাষ্ট্রের উদয় ঘটে।

অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো একক বা সমন্বিতভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু তা যদি তাদেরই কারও কারোর কারণে গোপনীয়তার বৃত্ত ভেদ করে বাইরে আসে তবে তা শুধু পেশাদারত্বেরই লঙ্ঘন নয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধী ও শপথ ভঙ্গের কুনজির এবং এ ব্যাপারে বিভাগীয় কিংবা সরকারের কোনো অনুকম্পার সুযোগ নেই। আমরা জানি, আরও কোনো কোনো ক্ষেত্রের মতোই পুলিশ বাহিনীতেও পদোন্নতি-বদলি কিংবা পদাবনতির ঘটনা ঘটেছে রাজনৈতিক বিবেচনায়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে। এ শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব ফেলেনি, জনস্বার্থেরও প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। পুলিশ জনগণের বন্ধুÑ এই আপ্তবাক্য পুলিশের তরফে তো বটেই, সরকারের পক্ষেও ফিরে ফিরে উচ্চারিত হয় বটে, কিন্তু এর প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান হয়নি রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে, এর সত্যতা অস্বীকারের অবকাশও ক্ষীণ। আধুনিক পুলিশের জনক হিসেবে খ্যাত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিল যথার্থই বলেছেন, ‘পুলিশই জনগণ এবং জনগণই পুলিশ’। তার এই উক্তিটি শুধু একটি রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকাই উপস্থাপন করেনি, জনসমাজে সংস্থাটির গুরুত্বও সমভাবেই তুলে ধরেছে। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের গোপনীয়তা ভঙ্গকারী এবং তথ্য ফাঁসের জন্য দায়ী যেকোনো কারোর যথাযথ প্রতিবিধান জরুরি। জনবান্ধব, স্বচ্ছ, দক্ষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশের পক্ষেই সম্ভব ন্যায় ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন ।