স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কেন ঝুঁকিপূর্ণ

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১২ এএম

২০০৭ সাল। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া মিশন হাসপাতালের পাঠ চুকিয়ে ২০০৪-এর শেষ দিকে তৎকালীন আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালের দায়িত্ব নিলাম। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে এখনকার মতো খুব আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকলেও চমৎকার লোকেশন, সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রথিতযশা চিকিৎসকদের কারণে এখানে ঢাকার আপার ক্লাস মানুষজন আস্থার সঙ্গে চিকিৎসা নিতে আসতেন। আমার বড় বোনের আগ্রহের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খুব ভালো একটা জায়গা ছেড়ে নতুন হাসপাতালের চ্যালেঞ্জটা নিলাম। বিভোর হয়ে হসপিটালটাকে বড় করতে শুরু করলাম। ২০০৫ সালে মাত্র ৪ বেডের অ্যাডাল্ট আইসিইউ স্থাপন করলাম। তখন হেলথ কেয়ার সেক্টরে সহজে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইতেন না। বাংলাদেশের স্বনামধন্য আমেরিকা ফেরত ইন্টেনসিভিস্ট প্রফেসর ডা. ওমর ফারুক ও ডা. আব্দুল ওয়াদুদ বেগকে সঙ্গে নিয়ে আইসিইউর যাত্রা শুরু করলাম । এই ইউনিটের যাত্রা শুরু হয় এবং জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। সেই সময় আইসিইউ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি, রীতিমতো সোনার হরিণ।

কিছুদিন পর ডেলিভারি কিংবা সিজারিয়ান অপারেশনের পর নবজাতক শিশুদের জন্য আইসিইউর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মাত্র ৬ বেডের একটি আইসিইউ স্টার্ট করলাম। বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. মনির হোসেনের তত্ত্বাবধানে ডা. মামুন, ডা. বিপুল, ডা. মানিফা এবং দক্ষ কিছু নার্সকে সঙ্গে নিয়ে অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের এই ছোট ইউনিটটি ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। বর্তমানে এই আইসিইউ ৩০ বেডের, অ্যাডাল্ট আইসিইউ ২৫ বেডের, স্টেপ ডাউনসহ এই হাসপাতালে জিরো টু অ্যাডাল্ট আইসিইউর সংখ্যা প্রায় ১০০ শয্যার। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল নতুন ১৫ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট উদ্বোধন করেন এবং এর গুণগত মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। স্বনামধন্য আইসিইউ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মাকসুদুল আলম বাসু, ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান এবং ডা. ফারহা আন্দালিব ও তার এক্সপার্ট ডাক্তার-নার্সের সমন্বয়ে মানুষের কল্যাণে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন রোগীদের। একটি অশ্রুসিক্ত ঘটনার কারণে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট পেডিয়াট্রিক আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিলাম।

একদিনের একটি ঘটনা। রাত তখন ৯টা। একটা অ্যাম্বুলেন্স নরসিংদী থেকে এলো। স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর উন্নত চিকিৎসার আকুতি চোখে ভেসে উঠল। দ্রুত রোগীকে নেওয়া হলো, বয়স ৫-৬ হবে, কন্যাশিশু। ওর গায়ে হাত দিয়ে শীতল পরশে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ইমার্জেন্সি ডাক্তার সব পরীক্ষা করে বললেন, শিশুটি পথের মাঝে অনেক আগেই মারা গেছে। মা-বাবার গগনবিদারী চিৎকার এখনো কানে বাজে। চিকিৎসক হয়েও ভাবলাম এই শোক কী করে সইবে তারা! ঢাকা আসার পথে পথিমধ্যে মাতুয়াইল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল, শিশু হাসপাতাল ও আরেকটি বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে ৬ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে তৎকালীন আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে আসে ওই হতভাগা শিশুটি। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি সেদিন। সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিলাম পেডিয়াট্রিক আইসিইউ করব, বিনা চিকিৎসায় যেন শিশুদের প্রাণ না যায়। অল্প দিনের মধ্যেই ৫ বেডের পিআইসিইউ এবং ৪ বেডের ডায়ালিসিস ইউনিট চালু করলাম। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান এবং প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্যারসহ বেশ কজন বিশিষ্ট চিকিৎসক এই ইউনিট দুটি উদ্বোধন করেছিলেন। আমাদের ছোট ৫০ বেডের হাসপাতাল এখন ৩৫০ শয্যাবিশিষ্ট ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ইতিমধ্যে এই চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এক যুগে পদার্পণ করেছে।

সম্প্রতি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের একজন ক্রিটিক্যাল শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া এবং কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম। তাদের বক্তব্য, ভুল চিকিৎসায় শিশু আভানের মৃত্যু হয়েছে। কথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিউ ব্যবসার জন্য একটু পর পর ছদ্মবেশে একেকবার একেক রকম মুখরোচক চটকদার বক্তব্যে সয়লাব। বাচ্চার বাবার অভিযোগ তার বাচ্চাকে ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলেছে। রোগী মারার জন্য তো এফসিপিএস, এমডি, পিএইচডি কিংবা এফআরসিপিসিএইচ ডিগ্রি লাগে না! কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভেন্টিলেটর, ওয়ার্মার, ডিফিব্রিলেটর, ফুল টাইম স্পেশালিস্ট রেখে পিসিইউ করে নিজের মানসম্মান ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন কে হতে চান! শিশুটির ভুল চিকিৎসা হয়নি। আমাদের নিজেদের তদন্ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। কিন্তু এরপর ভুল চিকিৎসার গল্প বাদ দিয়ে শুরু হলো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। অশ্লীল ও নোংরাভাবে হেয় করার অপচেষ্টা! ভিউ ব্যবসায়ী হয়তো ২-৩শ ডলার কামিয়েছে। সঙ্গে কিছু বিপথগামী ডাক্তারও এই অপপ্রচারে যুক্ত হন। কিন্তু ক্ষতি হলো সাধারণ মানুষের।

 হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ডাক্তার দেবী শেঠীকে ভগবান শেঠী বানিয়েছে তাদের দেশের মানুষের ভালোবাসা আর সম্মান। আর আমার দেশের আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ ডাক্তার মোমেনুজ্জামান স্যারকে কোর্টে তুলে উল্লাস করে আমার দেশের মানুষ! বুঝতে পারছি মানুষ কেন নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যায়। কিন্তু আমি এদেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। কারণ সোনার বাংলাকে ভালোবাসি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ আপনার এই স্বপ্ন পূরণে একজন মানুষকেও যদি আপনি খোঁজেন আমি সবার আগে হাত তুলব। শিশু আভানের জন্য শোকগাথা। বাবা-মায়ের প্রতি গভীর সমবেদনা। ডাক্তার হলেও, আমিও একজন বাবা।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত