ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা ‘ব্যর্থ’!

৭ অক্টোবর ২০২৩, ইসরায়েলে এক নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই হামলাকে কেন্দ্র করে গাজায় শুরু হয় ইসরায়েলের আগ্রাসন। হামাস নিমূলের নামে টানা দুবছর গাজায় তাণ্ডব চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। গাজা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপের নগরীতে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ এনেছে। গাজায় এই বর্বরতার কারণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। গতকাল বুধবার গাজা যুদ্ধের ৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই সংঘাতে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু। এটি গাজার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হয়নি। এখনো ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালাচ্ছে এবং উপত্যকাটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা তাদের দখলে। সেখানকার ফিলিস্তিনিরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনাটির প্রথম ধাপের অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলায় অপহৃত সর্বশেষ জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা শত শত ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি নিশ্চিত হয়েছিল। তবে হামাসকে নিরস্ত্র করা, ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠনের মতো অন্য লক্ষ্যগুলো এখনো অনেক দূরে। ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে অন্তর্ভুক্ত ছিল, সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত করা, উপত্যকার কিছু অংশ থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তি এবং ত্রাণ সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো। পরের ধাপগুলোতে হামাসকে নিরস্ত্র করার এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন একটি শান্তি পর্ষদের তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিনিদের দিয়ে নতুন সরকার গঠনের পরিকল্পনা ছিল। এর সঙ্গে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সের’ (আইএসএফ) কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, গাজার মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, তাদের জন্য পুরো এলাকাটি নতুনভাবে গড়ে তোলা হবে। তবে এই শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখনো দূরের বাতিঘর। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল।

গাজায় এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। অর্থাৎ সেখানে প্রতি ১৩ জনের মধ্যে একজন ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ীÑ আহতদের প্রায় ২৪ শতাংশই এমন গুরুতর যে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশই শিশু। ইসরায়েলি হামলার পরও গাজায় বর্তমানে যে কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র টিকে আছে, সেগুলো অনেক বেশি রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটের মধ্যে সেগুলো চালাতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে হাসপাতালে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৩৬১ দিনের মধ্যে ৩২৫ দিনই ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল গাজার নাজুক পানি অবকাঠামোর ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। তারা সেখানকার কূপ, পাইপলাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার অধিকাংশ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং পানির কূপগুলো হয় পয়ঃবর্জ্যরে কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে, অথবা যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে সেগুলো অকেজো হয়ে আছে। ইসরায়েল ও মিসর সীমান্তে প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা উপত্যকায় ধ্বংসযজ্ঞ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখানকার মোট স্থাপনার ৮২ শতাংশই বিধ্বস্ত হয়েছে।